170746

বাঁধনহারা এই মাতাল সময়ে স্বপ্ন ও সভ্যতার নির্ভয় আশ্রয়

মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন ।। অথিতি লেখক


একটি মজার ঘটনা দিয়ে শুরু করি। নাম খাওয়াত। বাবার নাম জুবাইর। তার উর্ধ্বতন চতুর্থ পুরুষ কবিসম্রাট ইমরুল কায়েস। খাওয়াত ছিলেন একজন আনসারি সাহাবি। বদর ও ওহুদসহ বড় বড় অনেক যুদ্ধ নবীজি সা. এর সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছেন। ঘটনাটা তাঁর।

তখনো মুসলমান হননি। হাঁটতে গিয়ে দেখলেন ক’জন আরব্য রমনী। মন ‘সন’ হয়ে উঠল। রমনীরূপ তাকে টেনে ধরেছে। ভাবলেন কিভাবে গল্প পাতা যায় এদের সঙ্গে। পথ একটা পেলেন সঙ্গে সঙ্গে। কাছে গিয়ে বললেন, আমার উটটি পালিয়ে গেছে। বাঁধব। রশি দরকার। তোমরা আমাকে সামান্য রশি পাকিয়ে দিবে? তারপর রশির ছুতো ধরে বসে পড়লেন রমনীরসঙ্গে।

ঘটনাক্রমে একটু পরেই সে পথে যাচ্ছিলেন নবীজি সা.। মেয়েদের সঙ্গে খাওয়াতকে দেখে বিষয়টি আঁচ করলেন। কিছুই বললেন না। চলে গেলেন। তারপর যখন হযরত খাওয়াত রা. মুসলমান হলেন নবীজি মুচকি হেসে বললেন- ‘তোমার পলাতক উটের খবর কী?’

ইঙ্গিত বুঝে ফেললেন খাওয়াত। বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! ইসলাম ওটাকে বেঁধে ফেলেছে।’ [ইসাবা-তরজমা :২৪৪৩, সিরাতে হালবিয়া ২/১৪৭ এর সূত্রে দরসে মাকামাত : ২৬৮]

কথা হলো বাঁধন, এই বাঁধনের শক্তিতেই ইসলাম পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক সৌন্দর্যবিকশিত ধর্ম। এই বাঁধনে বিকশিত সৃংখলাশক্তিই একদা এই পৃথিবীকে দান করেছিল এক অবাক করা সমাজচিত্র।

অভাবিক শান্তি সমাহিত এই সমাজের যারা প্রতিষ্ঠাতা তাদের সম্পর্কে কুরআন বলেছে ‘মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল, তাঁর সঙ্গিীগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল; আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় তুমি তাদেরকে রুকু ও সেজদায় অবনত দেখতে পাবে। তাদের দৃষ্টান্ত একটি চারাগাছ। যা থেকে নির্গত হয় কিশলয়, অতঃপর তা শক্ত ও পুষ্ট হয় এবং পরে কাণ্ডের উপর দাঁড়ায় দৃঢ়ভাবে। যা চাষীর জন্যে আনন্দদায়ক।’ [ ফাতাহ:২৯]

ইসলাম একটি বাঁধন, একটি স্বভাবজাত যুক্তিগ্রাহ্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। এই নিয়ন্ত্রণ মানবজীবনের ইচ্ছা-স্বপ্ন-সখকে গলাটিপে হত্যা করে না। বরং সুনিয়ন্ত্রিতভাবে বিকশিত করে, করে অর্থময়। এই বাঁধনের শক্তিতেই যূথবদ্ধ বিকাশে পৃথিবীকে একদা প্রকম্পিত, শিহরিত ও ভাবান্তরিত করেছিল।

ফলে সমকালীন পৃথিবীর অভিধানে ইসলামের বিজয় এবং ইসলাম আর সম্মান সমার্থক হয়ে উঠেছিল। এই বাঁধনশক্তিকে উপেক্ষা করে যখনই আমরা স্বাধীন হতে চেয়েছি, তখনই পতিত হয়েছি, হয়েছি সমকালীন পশুসভ্যতার খেলার পুতুল। এই বাঁধনহীনতার বন্য উপমার এখন অভাব নেই। দুটি জঘন্য উপমার কথা বলি।

এক. ধর্মের নামে চালিত কথিত গায়রে মুকাল্লিদ সম্প্রদায়। এরা নিজেদেরকে ‘আহলে হাদিস’ কখনো বা ‘সাল্ফি’ নামে পরিচয় দিয়ে বেড়ায়। কথায় কথায় হাদিস ও বুখারি শরিফ বলে। কিন্তু হাদিস ও বুখারি শরিফ যাদের নিয়মিত পাঠের বিষয়- আলেম সমাজ তাঁদের সঙ্গে এরা বসতে নারাজ।

বরং আজান শুনলে যেমন শয়তান পালায় আলেম দেখলেও তারা সেভাবেই পালায়। আর যারা হাদিস বুঝে না, বুঝে না বুখারি শরিফ আর মোহাম্মদী পঞ্জিকার পার্থক্য, তাদেরকে গিয়ে হাদিস বুঝায়। যে নামাজ পড়ে না তাকে জীবনেও নামাজের দাওয়াত দেয় না।

যে মসজিদে গিয়ে নিয়মিত নামাজ পড়ে তাকে বলবে এখানে বেঁধেছো? তোমার নামাজই হয়নি। যে কুরআন পড়তে পারে না, তাকে কুরআন শিখাবে। কুরআন শুদ্ধ পড়তে না পারলে নামাজ হয় না। সে কথা বলবে না। বললে যদি বলা হয়- তাহলে তুমি আমাকে শুদ্ধ করে পড়িয়ে দাও। বরং বলবে- ফাতেহা না পড়লে নামাজ হয় না।

যদি বলা হয়, তাহলে শুদ্ধ করে ফাতেহাটা শিখিয়ে দাও। সঙ্গে সঙ্গে সটকে পড়বে আলোর আগমনে ভূতের পলায়নের মতো। কেন? ওদের আসল উদ্দেশ্য- মুসলমানদের মাঝে এটা হয়, ওটা হয় না বলে হতাশা সৃষ্টি করা। এবং বিশেষ করে মুসলমান সমাজের শেকড় আলেম সমাজ থেকে সাধারণ মানুষকে ছিন্ন করে ফেলা। যেন শেকড়ছেড়া এই সমাজকে যে কেউ যে কোনো নামে একটানে ইসলাম থেকে আলাদা করে ফেলতে পারে।

দুই. আমাদের এই আশঙ্কা যে অমূলক নয় তারও অনেক দৃষ্টান্ত আছে। এরই মধ্যে আমরা পত্রপত্রিকায় দেখেছি- আমাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড কৃষকরা তাদের রক্ত ও ঘামে উতপাদিত আলু পথে ফেলে তার উপর শুইয়ে পড়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

পত্রিকায় এসেছে কোথাও কোথাও আলুর কেজি শুধু পঁচাত্তুর পয়সা। অথচ এরই পাশে এক আগুনধরা সংবাদ শিরোনাম ‘বসন্তউতসব ও ভালোবাসা দিবসে যশোর থেকেই গেছে পাঁচ কোটি টাকার ফুল।’

অতঃপর সংবাদে বলা হয়েছে- বাঙালি বসন্তবরণ ও বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের আগেই দুই দিনে যশোরের গদখালির পাইকারি ফুলের বাজার থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত পাঁচ কোটি টাকার ফুল গেছে। আর পয়লা বসন্তে গতকাল ১৩.০২.১৪ বৃহস্পতিবারও প্রায় ২০ লাখ টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যশোর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে এ বছর যশোর জেলায় ৫৯৩ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের ফুলের চাষ হয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে মোট নয় হাজার ২০ জন কৃষক। [ প্রথম আলো:১৪.০২.১৪]

বলতে দ্বিধা নেই, এই যে আলু টনে টনে পঁচছে, মরছে আলুচাষী কৃষক আর ফুল বিক্রি হচ্ছে কোটি কোটি টাকার, হাসছে ফুলচাষী এই হাসিকান্না আলু ও ফুলের নয়। জীবন ও বসন্তের কিংবা জীবন ও প্রেমের। সন্দেহ নেই- কবিতার জন্যে এ এক অনুপম অপূর্ব শুভসংবাদ। আমাদের এই দেশে এখন তুচ্ছ আলুর চাইতে ফুলের কদর বেশি। মানে এখানে বেঁচে থাকার চাইতে ভালোবাসার মূল্য অনেক বেশি।

অতঃপর সেই প্রেম ও বসন্তের একটি আধুনিকতম টাটকা সংবাদ দিই ‘বসন্ত উতসবে বয়ফ্রেন্ড ভাড়া’ সংবাদ শিরোনাম। অতঃপর সংবাদ ভাষ্য বসন্তে সঙ্গীর অভাব ও একাকীত্ব দূর করতেই চীনে গড়ে উঠেছে বয়ফ্রেন্ড ভাড়া দেওয়া প্রতিষ্ঠান। এবারও বসন্তেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

চীনাদের সবচেয়ে বড় বসন্তবরণ উতসব গত শুক্রবার [৭.২.১৪] থেকে শুরু হয়েছে। এ উতসবকে অবিবাহিত, বয়ফ্রেন্ডহীন তরুণীদের জন্য অশুভ বলে ধারণা করা হয়। এ কারণেই বহু পরিবার তাদের অবিবাহিত মেয়েদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে। তাই এ ব্যবস্থা।

চীনের অনলাইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান টোওযোয়ারে বয়ফ্রেন্ড ভাড়া নেয়ার জন্য একটি বিভাগ আছে। সেখানে রেটও নির্ধারিত করা আছে। এ রেট বয়ফ্রেন্ডের ধরন অনুসারে বিভিন্ন রকমের। তবে প্রতিদিনের জন্যে ন্যূনতম ৮২ ডলারে যে কেউ বয়ফ্রেন্ড ভাড়া নিতে পারেন।

এ রেট বয়ফ্রেন্ডের ধরন অনুসারে বাড়বে। সর্বোচ্চ মানের কোনো বয়ফ্রেন্ড পেতে তরুণীকে খরচ করতে হবে ১ হাজার ৩২১ ডলার। এ প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত মুক্ত আলিঙ্গন, হাত ধরে হাঁটা ও বিদায়ী চুমু। এর বেশি কিছু চাইলে তরুণীকে আলাদা অর্থ গুণতে হবে। [আমাদের সময় : ১৩.২.১৪]

এখানে দীর্ঘ ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। আলু পঁচছে আর ফুল হাসছে। এর ভেতর দিয়ে আমরা বাধঁনহারা যে প্রেম ও বসন্তের দিকে যাচ্ছি তার এক জীবন্ত ছবি এই সংবাদটি।

চীনের মতো হয়তো বয়ফ্রেন্ড দেয়ার মতো সংগঠনের বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হচ্ছে না আমাদের দেশে, কিন্তু বয়ফ্রেন্ড আর গার্লফ্রেন্ড বিনিময়ের বাজার যে চাঙ্গাভাবেই চলছে সে কথা বলে দিচ্ছে ফুলের বাজার। তারই পথে পাল্লা দিয়ে সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে বিয়ে বিচ্ছেদ আর প্রেমজনিত খুনের ঘটনা। তরুণ-তরুণীদেও অবাধ উচ্ছ্বাসে কলকল করা সরকারি ও প্রাইভেট ইউনির্ভাসিটিগুলোর পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় নির্ণয় করা কঠিন এদের এই বিদ্যালয় কি প্রেমের তীর্থভূমি না বিদ্যানিকেতন। এ কোন সভ্যতার দিকে যাচ্ছি আমরা!

জীবনের সকল ক্ষেত্রেই চলছে এখন এই বাঁধন ছেঁড়ার যুদ্ধ। বাঁধনহারা গার্মেন্টসশিল্পীদের ফুঁসে ওঠা বিপ্লবে দেশের একমাত্র উতপাদনক্ষেত্র এখন মরি মরি করছে। বাঁধনহারা ছাত্রলীগের ধ্বংসলীলায় স্তম্ভিত বাংলাদেশ এখন ছাত্ররাজনীতির নাম শুনলেই বলে ওঠছে আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম। বাঁধনহারা মন্ত্রী-এমপিদের অর্থকেলেঙ্কারী রাজনীতিকে করেছে ছি ছি কলঙ্কের পথ। ভবিষ্যতে হয়তো সভ্য মানুষের জন্যে মন্ত্রী এমপি কথাটা একটা গালি হয়ে দাঁড়াবে।

বাঁধনহারা পোশাকে উন্মাদ তরুণীদের মাতাল উপস্থিতি একুশে মেলাকে করেছে টানটান তরুণীর হাট। বইয়ের স্টলে তরুণী বই দেখে, না বইবিক্রেতা দেখে তরুণীর মুক্ত গতর কে করবে পার্থক্য। উন্মাদ তরুণ সারাদিন ঘুরছে বইমেলায়। কিন্তু কিসের নেশায়? বই না অন্য কিছু এসবই বাঁধনহারা পশ্চিমা সভ্যতার কলঙ্ক। ভয় ও কলঙ্কের কথা হলো, আমাদের মাতাল কবি সাহিত্যিকরা উত্তাল এই উন্মাদনাকেই গ্রহণ করছে তাদের রচনার বিষয় হিসেবে। ফলে ভাড়াটে বয়ফ্রেন্ড জাতীয় প্রেমের উতকট গন্ধে মেলার কাছে ভিড়তে পারছে না সমাজের সভ্য মানুষরা। এই পতনের শেষ কোথায়?

কালের এই ক্রান্তিকালে সব স্বপ্ন এসে আছড়ে পড়ে একটি জায়গায় কওমি মাদরাসা। এখনো বাঁধনে অটুট এই শিক্ষাশিবিরই জ্ঞান চিন্তা স্বপ্ন ও সভ্যতার নির্ভয় আশ্রয়। আর বাধঁনটাই এদের সবচে বড় হাতিয়ার। বাঁধনহারা পৃথিবীর উন্মাদ পথচলা দেখে দৃঢ় হোক এই শিবিরের বাঁধনপ্রীতি। ভেঙে পড়া সভ্যতা, কলঙ্কিত মানবপ্রেম আর পুড়ে যাওয়া সংস্কৃতি আবারো জেগে ওঠুক নতুন আশ্বাসে, নতুন সজীবতায় আর মহতি বিশ্বাসের দোলায় স্বপ্নে সংগ্রামে এবং নির্মাণের সকল প্রাঙ্গনে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও মুহাদ্দিস

আরএম/

 

ad

পাঠকের মতামত

Comments are closed.