172462

চারদিকে বন্যসুখের পৈশাচিক উল্লাস!

জহির উদ্দিন বাবর।।

ছোট্ট শিশু তুহিন। বয়স সবেমাত্র পাঁচ। নিষ্ঠুরতার চরমতম ক্ষত নিয়ে সে পৃথিবী ছেড়েছে। কদমগাছের ডালে ঝুলছিল তার রক্তাক্ত নিথর দেহটি। গলায় রশি বাঁধা। পেটে ঢোকানো লম্বা দুটি ছুরি। বর্বরতার এখানেই শেষ নয়, কাটা হয়েছে তার গলা। দুটি কান ও পুরুষাঙ্গটিও কেটে নেয়া হয়েছে।

সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের এই হত্যাকাণ্ডটি সোমবার দিনভর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। বীভৎসভাবে খুন করা শিশুর মরদেহ এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। যারাই ছবিটি দেখেছেন খুনিদের জানিয়েছেন ধিক্কার। মানুষ কীভাবে এতোটা বর্বর, অসভ্য ও ইতর হতে পারে সেটা এই নৃশংসতা না দেখলে অনুমান করা যাবে না।

তবে দিন শেষে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে পুলিশের বরাতে যে তথ্য পাওয়া গেছে তা রীতিমতো আঁৎকে ওঠার মতো। বীভৎস উপায়ে শিশুটিকে হত্যার পেছনে যাদের প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে তারা শিশুটির পর কেউ নয়, একান্ত আপনজন। যাদের কাছে শিশুটি মমতাময় আশ্রয় পাওয়ার কথা তারাই শিশুটির ছোট্ট শরীরে বর্বরতার চরমতম আচড় লাগিয়েছে। খোদ শিশুটির বাবাও এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।

নিজ সন্তানকে এভাবে হত্যার পেছনে কারণ কী? কারণ জমিজমাসংক্রান্ত বিষয়ে চরম বিরোধ চলছিল প্রতিবেশী একজনের সঙ্গে। তাদেরকে ফাঁসানোর জন্যই মূলত এই বর্বরতম পথ বেছে নেন ঘৃণিত এই বাবা। শুধু নিজ সন্তানকে মেরেই ক্ষান্ত হয়নি, ছোট্ট শিশুটির শরীরে বীভৎসতার চিহ্ন আরোপ করা হয়, যাতে সহজে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা যায়। এমনকি যে দুটি ছুরি শিশুটির পেটে ঢুকিয়ে দেয়া হয় সেগুলোতে প্রতিবেশী যাদের সঙ্গে বিরোধ সেই দুজনের নাম লেখা ছিল। তাদের ধারণা ছিল, ওই নাম দেখে সহজেই প্রতিপক্ষকে ধরবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু এই কৌশল যে তাদের জন্য কাল হবে সেটা তারা বুঝতে পারেনি। নিজের নাম লেখা ছুরি দিয়ে কেউ খুন করবে সেটা কোনো পাগলেও বিশ্বাস করার কথা নয়।

দ্বিতীয় ঘটনাটি টাঙ্গাইলের। গত শনিবার রাতে শহরের ভাল্লুককান্দি এলাকা থেকে অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ এবং তার চার বছরের শিশুকন্যার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মা-মেয়েকে গলাকেটে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশ এই ঘটনার ক্লু উদ্ধার করেছে। ঘটনাটি ঘটিয়েছেন গৃহকর্তা আল আমিনের একান্ত বন্ধু, যার নাম রাইজ উদ্দিন। বন্ধুত্বের কারণে ওই বাড়িতে রাইজ উদ্দিনের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। ব্যবসায়ী আল আমিন বাসায় প্রায় আট লাখ টাকা রেখেছিলেন। সেটা কোনোভাবে জেনে যান রাইজ উদ্দিন। আর এই টাকার লোভেই বন্ধুর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে প্রথমে হত্যা করেন। কিন্তু চার বছরের মেয়ে আলিফা ঘটনাটি দেখে ফেলায় তাকেও হত্যা করে টাকা নিয়ে পালান রাইজ উদ্দিন। তবে শেষ পর্যন্ত পুলিশের হাতে ধরা পড়েন তিনি।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া আরেকটি ভিন্নধর্মী ঘটনা এই টাঙ্গাইলেরই। ‘স্ত্রীকে তালাক দিয়ে শাশুড়িকে বিয়ে’ এমন একটি খবর ফলাও করে প্রচারিত হয় দেশের প্রায় সব গণমাধ্যমে। খবরটি প্রথমে দেখে ভেবেছিলাম, হয়ত পাশের দেশ ভারতের হবে। কারণ সেখানে এ ধরনের আজগুবি কাজ-কারবার প্রায়ই ঘটে। কিন্তু খবরে ঢুকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল, আমাদের দেশেরই ঘটনা এটি। ধর্মীয় অনুশাসন, সামাজিক রীতিনীতি সবকিছু উপেক্ষা করে বিয়ের মাত্র ১১ দিনের মাথায় স্ত্রীকে তালাক দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে শাশুড়িকে বিয়ে করেন মোনছের আলী আলী নামক এক যুবক। ঘটনাটি দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। এলাকাবাসীসহ সবাই ধিক্কার জানিয়েছে তাদেরকে। এই ঘটনাটি বিকৃত মানসিকতার উদাহরণ স্থাপন করেছে।

দুই.

উপরের তিনটি ঘটনায় একটা বিষয় পরিষ্কার, দিন দিন মানুষের ভেতর হিংস্রতা, বন্যসুখ আর বিকৃত মানসিকতার উদ্ভব ঘটছে। ভোগবাদী মানসিকতার কারণে মানুষ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে। অন্যকে ঘায়েল করতে বেছে নিচ্ছে হিংস্রতার পথ। নিজে ভালো থাকার জন্য কেড়ে নিচ্ছে অন্যের সুখ। কীভাবে আরও বেশি ভোগ করা যাবে, কীভাবে আরও বেশি লাভ করা যাবে সেটার প্রতিযোগিতা চলছে চারদিকে। অযাচিত এই প্রতিযোগিতা মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব থেকে পশুত্বের কাতারে নামিয়ে দিচ্ছে।

মাত্র সেদিন একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে নৃশংস কায়দায় খুন করেছে তারই সহপাঠী ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা। বিরোধী মতকে দমনের জন্য মানুষ কতটা হিংস্র হতে পারে এর নজির স্থাপন করেছে বুয়েটের তথাকথিত মেধাবী শিক্ষার্থীরা।

দিন দিন এসব ঘটনা আমাদের সমাজে বাড়ছে। একটি হিংস্রতা দেখে আরেকটি হিংস্রতার জন্ম নিচ্ছে। হিংসা থেকে জন্ম নিচ্ছে প্রতিহিংসা। আদিম ও বন্যসুখে মেতে উঠছে সবাই। এভাবে দিন দিন অস্থির হয়ে উঠছে সমাজ ও সভ্যতা। এর ভয়াবহতম পরিণতির জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া কি আমাদের কিছুই করার নেই! কিছু করার থাকলে এখনই করতে হবে। সময় গড়িয়ে গেলে তা আর নিয়ন্ত্রণের ভেতরে থাকবে না। তখন হায় হায় করেও কোনো লাভ হবে না।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী লেখক ফোরাম

ad

পাঠকের মতামত

Comments are closed.