174550

অনন্য বিজেতার অনবদ্য বিজয় কাহিনী

আ.আজিজ রোমান ।।

বিজিত অঞ্চলে প্রবেশ করছেন মহান এক বিজেতা। কোনও ঔদ্ধত্য-অহংকার ও কঠোরতা নেই তাঁর মধ্যে। আজ তিনি শান্ত সমাহিত বিনীত। বিনয়াবনত বদন যেন উটের হাওদায় লেগে যাবে। পবিত্র জবানে সুরা ফাতহ তেলাওয়াত করছেন। অন্তর জুড়ে বিরাজ করছে রবের প্রতি অকৃত্রিম শুকরিয়া। পরম করুণাময় কৃত ওয়াদা বাস্তবায়িত করে পুরো শহর নিজ দয়ায় তাঁর হাতে তুলে দিয়েছেন।

এটা সে শহর, যেখানে তিনি বেড়ে উঠেছেন। আমিনার কোলে দীপ্ত রবি হয়ে উদিত হওয়ার পর এখানে কাটিয়েছেন শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্য। এর পরতে পরতে স্মৃতিরা লুকিয়ে আছে। অথচ কিছু লোক অকথ্য জুলুম করেছিল তাঁর ওপর, নবুওয়াতের দাবির কারণে। হাজারো নির্যাতন-নিপীড়ন সয়েছেন এখানে। শেষতক আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে হিজরত করেছেন। উঁচু-নিচু বন্ধুর পথ মাড়িয়ে। পদে পদে ছিল ধরা পড়ার আশঙ্কা

হৃদয়ের ক্ষতগুলো ছিল জীবন্ত। এগুলো শুকোয়নি এখনও। আজ সেসব দুষ্ট প্রকৃতির জালেমদের হাতের নাগালে এনে দিয়েছেন মহান রব। সুন্দর করে পরিবেশন করেছেন তাঁর সামনে। ইচ্ছে করলেই শত্রুদের কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলতে পারেন। কর্তিত অঙ্গগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিতে পারেন সাফা মারওয়ায়।

রক্তগঙ্গা বইয়ে দিতে পারতেন, হালাকুর মতো। উপাসনালয়ে আশ্রয় নেয়া লোকগুলোকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খার করে দিতে পারতেন, ফারদিনান্দ-ইসাবেলার মতো। তিনি এমনটি করেননি, কারণ বিশ্বজাহানের জন্য রহমত স্বরূপ তিনি প্রেরিত। নিজে যেমন এসব করেননি, তেমনি সাথী-সঙ্গীদেরও এসব করতে দেননি। কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন।

আপন সাহাবি আনসারদের পতাকাবাহী সাদ রাদি.-,’ আজ রক্তপ্রবাহের দিন’ বললে পতাকাই ছিনিয়ে নেন তাঁর হাত থেকে! সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন। বললেন, যারা আবু-সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে তারা মুক্ত, মসজিদে হারামে চলে গেলে মুক্ত, নিজঘরে দুয়ার বন্ধ করে রাখলে মুক্ত। এমনকি অস্ত্রধারী সম্মুখ সমরে না-গিয়ে হাতিয়ার রেখে আত্মসমর্পণ করলে মুক্ত।

চাষা শত চেষ্টা করলেও ফসলি জমি আগাছা মুক্ত রাখতে পারে না। খেতে গজিয়ে ওঠে আগাছা। সোনালি ফসল রক্ষার্থে চাষা বাধ্য হয় আগাছা ছাঁটাই করতে। নবিজি সা.-ও সঙ্গিদের আদেশ দিয়েছিলেন,’কেউ যেন প্রথমে হামলা না করে, আক্রমণ হলে প্রতিহত করা হবে; তরবারি ব্যবহার করা হবে। অন্যথায় তলোয়ার ব্যবহার করা হবে না!’

দুষ্ট প্রকৃতির কতিপয় আগাছা রয়েই গেল। সম্মুখ সমরে আবির্ভূত হলো তারা। সাহাবায়ে কেরাম তখনই কেবল তরবারি ব্যবহার করলেন। তাদেরকে সমুচিত জবাব দিলেন।

নবিজি সা. প্রবেশ করলেন আল্লাহর ঘরে, বাইতুল্লায়। তিনশো ষাটটি মূর্তি রাখা ছিল ভেতরে-বাইরে ও আঙ্গিনায়। মুশরিকদের নাপাক ক্ষমতাহীন উপাস্য এসব। পূতঃপবিত্র দয়াময়ের ঘরে অপবিত্র কিছু থাকতে পারে না। হাতে থাকা লাঠি দিয়ে মৃদু আঘাত করলেন নবিজি সা. একেকটিকে। অপারগ মাবুদেরা নিজেদেরও রক্ষা করতে পারেনি। ভেঙে টুকরো টুকরো হলো। কাবায় প্রবেশ করলেন প্রিয় নবি সা.। শোকরানার আট রাকাত সালাত আদায় করলেন সেখানে।

মুশরিকরা জাতির পিতা ইবারাহিম আ.-এর ছবি এঁটে রেখেছিল কাবার অভ্যন্তরে। তাঁর হাতে জড়ানো ছিল ভাগ্য নির্ণয়ের গুটি। যিনি আমাদের নামকরণ করেছিলেন মুসলিম বলে, তিনি এসবে বিশ্বাসী ছিলেন না। নবিজি সা. এসব ছবিও নামিয়ে দিলেন। আজ মহামহিম নিজ দীনকে বিজয়ী করেছেন, আরব উপদ্বীপে। তাই এখানেও কোন ‘মূর্তি’ থাকতে পারে না। নবিজি সা. সাহাবিদের নেতৃত্বে সেনাদল পাঠালেন, বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত পাথরের মূর্তিগুলোকে গুঁড়িয়ে দিতে। সহাবিরা এসব পাথরখণ্ড গুঁড়িয়ে দিলেন।

মক্কা বিজয় হলো। কুফফার দল ছুটে আসল কাবা প্রাঙ্গনে। বিজয়ীর পরবর্তী ভূমিকা কি হয় তা দেখার জন্য। বেরিয়ে আসলেন প্রিয় নবি সা. মাসজিদুল হারামের আঙিনায়। হামদ-সানা পড়ে সমবেত জনতার লক্ষ্যে খুতবা দিলেন। বললেন, আজ তোমরা আমার থেকে কেমন আচরণ প্রত্যাশা করো? উত্তম আচরণের প্রত্যাশা করি, সমস্বরে বলল সমবেত জনতা। নবিজি সা. বললেন, ‘ঠিক আছে, আজ তোমাদের ক্ষেত্রে সে কথাই বলছি, যে কথা আল্লাহর নবি ইউসুফ আ. তাঁর ভাইদের বলেছিলেন। লা-তাসরিবা আলাইকুমুল ইয়াওম, তোমাদের জন্য প্রতিশোধহীন সাধারণ ক্ষমা।’

পৃথিবী অবাক বিস্ময়ে দেখল এক মহা-বিজয়, অনেকটাই রক্তপাতহীন। বিশ্ব-ইতিহাসে বিজয়ের এমন উদাহরণ আরেকটি নেই। কিভাবে এমন হলো? কারণ তিনি অনন্য বিজেতা, সুন্দর তাঁর বিজয়-সংগ্রাম; অনবদ্য তাঁর বিজয়-কাহিনি।

সহায়ক গ্রন্থ: ১. সিরাতে মুস্তফা -ইদরিস কান্ধালুবি র., . আর-রাহিকুল মাখতুম -মুবারকপুরি র., . নবিয়ে রহমত -আলী মিয়া নদবি র., তারিখুল ইসলাম -মুহাম্মদ মিয়া। 

আরএম/

ad

পাঠকের মতামত

Comments are closed.