176527

ওয়াজ: করার কথা আর না করার কথা

মুসা আল হাফিজ ।।

সারা শহর কাঁপছে শব্দের তুফানে। চিৎকার। আল্লামা তাকি উসমানীর ভাষায় ‘লাউড স্পীকারের অত্যাচার।’ উপশহর আবাসিক এরিয়া। ডান দিক থেকে সুরের নহবত বাজছে। সামনে এক বক্তা ট্রাম্পের মুণ্ডপাত করছেন। নিকট থেকে, অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে আওয়াজ, আওয়াজ আর আওয়াজ। এসব আয়োজন, আশা করতে চাই ইসলামের জন্য। দীনি প্রেরণা কাজ করছে আয়োজনের গোড়ায়!

কিন্তু বন্ধুগণ! মহৎ কাজ খারাপ পদ্ধতিতে হয় না। শব্দ দিয়ে জুলুম করাও জুলুম। ওয়াজে যারা আসেন, তাদের শ্রবনে যথেষ্ট হয়, সেই মাত্রায় রাখুন শব্দকে। শহরের রোগী, ঘুমকাতর, কাজমগ্ন, অন্যমনস্ক মানুষগুলোকে জোর করে উচ্চশব্দের দ্বারা বিব্রত করার অনুমতি শরিয়ত আপনাকে দেয় না।

ওয়াজকে যেভাবে শীতকালীন বিনোদনের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তাতে আমি ভীত, ভীত খুব। দশ বছর আগে যা অকল্পনীয় ছিলো, তা এখন প্রথায় পরিণত হয়েছে। যেনতেন প্রকারে ওয়াজ মাহফিলের সংখ্যা বাড়াকেই যদি দ্বীনী চেতনার প্রকাশ মনে করেন, তাহলে এ হবে আত্মঘাতি। নসিহত যখন তার আদি ও অকৃত্রিম বৈশিষ্ট্য হারায়, তখন সে আর দ্বীনী চেতনার প্রসার ঘটায় না। দ্বীনের জন্য সে বিপজ্জনক রুপও গ্রহণ করে।

বর্তমান ওয়াজে আমি মোঘল আমলের পতনের সময়ের প্রতিযোগিতামূলক ওয়াজপ্রথার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছি। তখন মানুষের কাছে বিনোদনের মাধ্যম হয়ে উঠেছিলো ঘোড় দৌড়, কবিগান, মল্লযুদ্ধ, সেমার মাহফিল, বিতর্কসভা এবং গলাবাজির ওয়াজ। মানুষ এগুলো নিয়েই ব্যস্ত ছিলো। কার চেয়ে বেশি আয়োজন করে কে দেখাবে, এ নিয়ে হতো প্রতিযোগিতা। শিয়া ও বেদআতিরা এ সবের মধ্যে মজা পেতো বেশি।

ওয়াজ মাহফিলগুলোতে এক গোষ্ঠী অপর গোষ্ঠীকে গালাগালি করতেন। বিবাদের কাদা ছুড়াছুঁড়ি করতেন। অধিক মাত্রায় গলাবাজির মধ্যেই ছিলো বীরত্ব। এক এলাকা আরেক এলাকার সাথে বৃহৎ আয়োজনের প্রতিযোগিতা করতো! অপর দিকে পর্তুগিজ আর মারাঠারা গিলে নিচ্ছিলো দেশ।

সেকালের সচেতন কিন্তু হাতেগোণা আলেমগণ দীনের নামে চলমান এ সব প্রথার সমালোচনা করেন। আল্লামা আবদুল হক দেহলভীর সতর্কবাণীও কেউই কানে নিচ্ছিলো না। তিনি বলেছিলেন, দীনকে বিনোদন বানিয়ো না। স্বেচ্ছাচার ও টাকা রোজগারের হাতিয়ার বানিয়ো না। ওয়াজ, ফতুয়া ও দ্বীনী নেতৃত্বকে তার আহালদের হাতে তুলে দাও। কিন্তু কে শোনে কার কথা?

ফল কী দাঁড়ালো? মারাঠাদের হাতে উজাড় হলো হাজারো জনপদ। শত শত দীনী মারকাজ। দীনকে দীনের ভারসাম্যের জায়গায় রাখতে হবে। যখন তাকে প্রত্যেকেই লাওয়ারিস সম্পত্তি মনে করে যার তার মতো সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করতে থাকবে, তখন বুঝতে হবে জাতির কপালে দুর্গতি আছে।

তাহলে প্রচলিত ওয়াজের বিকল্প কী? প্রচলিত ওয়াজের বিকল্প শরিয়া নির্দেশিত ইতিবাচক ওয়াজ। ওয়াজ-নসীহত নবীদের কর্মপদ্ধতি। এমন কোনো নবী নেই, যিনি নসীহত করেন নি মানুষকে। হুজুর সা. এর প্রধান কর্মপদ্ধতি ছিলো নসীহত-ওয়াজ।

নবীদের সেই সুন্নাহ প্রতিফলিত হয়েছে দা’ওয়াতে দীন, আমর বিল মারুফ, নাহি আনিল মুনকার, তাযকিয়ায়ে বাতিন, তাহযিবে আখলাক ও তাহসিনে আ’মালের ক্ষেত্রে। ফলে তাবলীগে রেসালাতের অপরিহার্য হাতিয়ার হয়ে উঠে ওয়াজ।

সাহাবা-তাবেয়ী যুগে ওয়াজ অব্যাহত থেকেছে দীনের ভাষ্য হিসেবে। বিদগ্ধ বহু সাহাবী, তাবেয়ী ওয়াজ থেকে বিরত থাকতেন, ভয় পেতেন। খুব কম সংখ্যক সাহাবী-তাবেয়ী জনসমাগমে ওয়াজ করতেন। তারা ভয় পেতেন খোদার কাছে জবাবদিহিতাকে। আপন বক্তব্য ও কর্মে যদি সমন্বয় না থাকে, তাহলে খোদা যদি আটকে দেন!!

নির্দিষ্ট কয়েকজনই মাত্র ওয়াজ করতেন এবং তাদের নসিহত জীবন ও জগতের প্রয়োজন পূরণ করতো। খুব দীর্ঘ হতো না সেসব ওয়াজ। খওফে খোদা ও ফিকরে আখেরাত প্রধান্য পেতো আলোচনায়। মাসাইল ও আহকামাত বর্ণিত হতো, আখলাকে রেজিলার ইসলাহে তারগীব দেয়া হতো, তারহীব শুনানো হতো। ছোট ও সীমিত এসব ওয়াজের প্রভাব ছড়িয়ে পড়তো গোটা মুসলিম জাহানে। আমীর ফকির নির্বিশেষে সবাই এ থেকে দ্বীনী গেজা পেয়ে যেতো।

খায়রুল কুরুনের পরে বিভন্ন ফের্কার প্রভাবে ওয়াজে অনুপ্রবেশ করলো গোষ্ঠীতন্ত্র। গোষ্ঠীস্বার্থে দ্বীনকে ব্যাখ্যা শুরু হলো। বহু ওয়ায়েজ ফের্কাবাজীর নির্দেশে জাল হাদিস তৈরিতে লেগে গেলেন। বহু সুফি তারগীব তারহীবের স্বার্থে মিথ্যা হাদিস বর্ণনায় লিপ্ত হলেন। ওয়াজের মধ্যে দেখা দিলো বিকৃতি ও নৈরাজ্য।

সালতানাত এ পরিস্থিতিতে কোন শহরে কারা ওয়াজ করবেন, তা নির্ধারণ করে দিলো। যদিও সর্ববরেণ্য বুজুর্গদের জন্য সর্বত্র অবারিত ছিলো ওয়াজ – নসিহত।

এভাবেই চলছিলো যুগ যুগ ধরে। এ প্রক্রিয়ার মধ্যেও দেখা গেছে ক্ষতি ও বিপর্যয়। শাসক গোষ্ঠী নিজেদের লক্ষ্য বাস্তবায়নে রাজনিয়োজিত বহু ওয়ায়েজকে ব্যবহার করতে লাগলো। ফলে এ ব্যবস্থা আস্থা হারালো। ওয়াজ আবার উন্মুক্ত হতে থাকলো।

এভাবেই ওয়াজ ব্যবস্থা এগিয়েছে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে। যখনই তাতে বিপর্যয় দেখা গেছে,নতুন ব্যবস্থা সামনে এসেছে। তাকে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে আদি ও অকৃত্রিম চরিত্রে।

বর্তমানে ওয়াজব্যবস্থা এক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অনেকের কাছে এটা উপাদেয় এক পেশা। বিপুল আয়ের হাতিয়ার। অনেকের কাছে খ্যাতি ও ব্যক্তিত্ব প্রতিষ্ঠার সহজ ব্যবস্থা। অনেকের কাছে ফের্কা ও দলবাজীর উপকরণ।

এ সত্ত্বেও ওয়াজের মধ্য দিয়ে দাওয়াত ও ইরশাদের স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে। যোগ্যতর উলামার একটি অংশ এখনো এ ময়দানে সক্রিয়। ফলত এখনও দীনী প্রয়োজন পূরণে তার আবেদন ও উপযোগ দারুণ এক সম্ভাবনা।

কিন্তু এ সম্ভাবনা মার খাচ্ছে কতিপয় মন্দ প্রবনতা ও অযোগ্যের দৌরাত্ম্যে। এ প্রবনতা দূর করা গেলে এবং অযোগ্যদের ব্যাপারে উচিত পদক্ষেপ নিলে ওয়াজ আবারো ফিরে পাবে তার প্রাণশক্তি।

এক্ষেত্রে যা করা উচিত, তা হলো, ওয়াজকে এক ইবাদত হিসেবে তার পবিত্রতা ও স্বচ্ছতায় ফিরিয়ে নেয়া। সুর ও চিৎকার যদি মূখ্য হয়, বুঝতে হবে, এটা বিনোদনের চাহিদা। ইবাদতের চাহিদা নয়।

যেসব ওয়ায়েজ নির্ধারিত হারে টাকা দাবি করেন, তারা ওয়াজবণিক। তাদের পরিহার করুন। তাদের দাবিকৃত টাকা দেবেন না। যাতায়াতের ভাড়া এবং যৌক্তিক সম্মানীর অতিরিক্ত টাকা দেবেন না।

এই টাকা দিয়েই আপনারা তাদের লোভী বানিয়েছেন। সহজে প্রচুর কামানো যায় বলেই তারা একে পেশা হিসেবে ভাবতে শুরু করেছে। এ বিকৃতির জন্য আপনিও সমান মাত্রায় দায়ী।

এই টাকাগুলো মানুষের চাদার দান। তারা দিয়েছেন দ্বীনী কাজে ব্যবহারের জন্য, ইসরাফের জন্য নয়। অতএব বাহুল্য এড়ান। লোকপ্রদর্শনী যদি না চান, তাহলে বাহারি সজ্জা ও জাকজমক পরিহার করুন।ব্যায়কে সর্বনিম্নে নামিয়ে আনুন।

যে সব এলাকায় মাদরাসা রয়েছে, সেখানে মাদরাসার মাহফিলই হোক মূল মাহফিল। মাদরাসা ওয়াজের মাধ্যমে আওয়ামের সাথে তায়াল্লুক তৈরি করে, ঘনিষ্ঠ করে।এ থেকে সে দান সাদকা অর্জন করে। যা দ্বীনী শিক্ষায় গতি যোগায়।কাজে কাজেই সম্ভব হলে স্থানীয় সংস্থার ওয়াজকে মাদরাসার ওয়াজের সাথে যুক্ত করে নিন। দু’দিনে, দুই ব্যানারে একই জায়গায় হতে পারে ওয়াজ।

আওয়াজকে নিয়ন্ত্রণ করুন। সারা এলাকাকে সুরের তীব্রতায় কাঁপিয়ে তুলার কোনো অর্থ নেই। উপস্থিত স্রোতাদের মধ্যে আওয়াজকে সীমিত করুন, বিশেষত রাতে।

যেসব ওয়ায়েজ নির্ধারিত হারে টাকা দাবি করেন, তারা ওয়াজবণিক। তাদের পরিহার করুন। তাদের দাবিকৃত টাকা দেবেন না। যাতায়াতের ভাড়া এবং যৌক্তিক সম্মানীর অতিরিক্ত টাকা দেবেন না।

অতিথি নির্বাচনে আহলে ইলিম ও সাহেবে তাকওয়াদের প্রাধান্য দিন। যদিও তিনি গ্রাম্য ভাষায় ওয়াজ করেন। যদিও তার সুরে জাদু না থাকে।

ওয়াজ হোক জীবনঘনিষ্ঠ ও ইতিবাচক। নিত্যকার প্রয়োজনীয় আমল আখলাকের ওয়াজ করুন। হাজার রাত্রির কাহিনী থামান।

এই যে পাড়া মহল্লার মাহফিলে আপনি ট্রাম্পকে ফাঁসি দিচ্ছেন, বুশকে হত্যা করছেন, মোদিকে কানে ধরাচ্ছেন, বুকে হাত দিয়ে বলুন- এ অস্ফালন কি অজ্ঞ লোকদের সামনে নিজেকে বীর হিসেবে জাহির করার জন্য নয়? এসব তাদের জীবন- জগতে কী উপকার আনবে? ট্রাম্প-মোদির কি ক্ষতি করবে?

সবাইকে মাতিয়ে তোলা ও নাচিয়ে দেয়ার জন্য আপনি উদগ্রীব হচ্ছেন কেন? ঠিক ঠিক চিৎকার শুনতে অস্থির হচ্ছেন কেন? লোকেরা আস্তে করে সুবহানাল্লাহ বললে আপনি কেন জোরে বলার জন্য চাপাচাপি করছেন? কোথায় পেয়েছেন এর বৈধতা? সুবহানাল্লাহ কি জোরসে বলার স্লোগান? মসজিদেও আপনি আরো জোরে সুবহানাল্লাহ শুনতে চাচ্ছেন কেন? আপনি কি জানেন না মসজিদের আদব?

অপরাধপ্রবনতা দূরিকরণে ইতিবাচক ওয়াজ করুন।বুঝান। দলীল ও যুক্তি দিয়ে। হৃদয়ের ভাষায়,দরদ নিয়ে। আস্তে, চিৎকার যেন বেশি না হয়।

এই যে বলছেন, মানুষ হওয়ার শিক্ষা একমাত্র মাদরাসা শিক্ষা! ভুল বললেন। জাগতিক শিক্ষার গুরুত্ব আপনি অস্বীকার করতে পারেন না। মনুষ্যত্ব কোনো বিশেষ প্রতিষ্ঠানের স্বত্ব নয়। জেনারেল শিক্ষিতদের আঘাত করবেন না। শুনান, দ্বীন দুনিয়ার সমন্বয়ের পয়গাম। দুনিয়াকে দ্বীনের তাবে বানানোর বার্তা।

আপনি এখনো ছাত্র। ওয়াজে নেমেছেন কেন? আপনি যে মাদরাসার শিক্ষক নন, সেই মাদরাসার মুহাদ্দিস পরিচয়ে পোস্টারে ও ঘোষণায় আপনার নাম আসছে কেন? কোন কারিশমায়?

বলতে পারেন সুন্দর। তাই বলে মুফাসসিরে কুরআন নন আপনি। কোথায় তাফসীরে বিশেষজ্ঞ কোর্স করেছেন কিংবা কোথায় পড়াচ্ছেন তাফসীর? যখন তাফসীর মাহফিলের দাওয়াত আসছে, বলুন আমি মুফাসসির নই। যখন তাফসীর করতে বলা হচ্ছে, বলুন আমি মুফাসসির নই। এ কাজ আমার নয়।

যাকে তাকে কাফের বানাবেন না দয়া করে। ওয়াজ কাফেরকে মুসলমান বানানোর জন্য, মুসলমানকে কাফির বানানোর জন্য নয়।

আপনার ফের্কাগত প্রতিপক্ষ মানেই জাহান্নামী নয়। তাদের বিরোধিতার শরয়ী মাত্রা অবলম্বন করুন। আপনার ওয়াজ থেকে অন্য ঘরানার মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা নিয়ে লোকেরা যেন বাড়ি না ফেরে। ওয়াজ শুনে অন্য মুসলিমের প্রতি দরদ ও কল্যাণকামিতার পরিবর্তে বিদ্বেষ ও হিংসা যদি হয় লোকদের অর্জন, তাহলে এ ওয়াজ আত্মধ্বংসী । সেখানে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ফখরুদ্দীন ইরাকী রহ.।

ওয়াজ যদি আদাবে দাওয়াত ও তাকাযায়ে হিকমাহ এর ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাহলে তা অবশ্যই দ্বীনের কল্যাণ নিশ্চিত করবে। তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এতে অংশ গ্রহণ করছে। অপসংস্কৃতির প্রতি যারা ধাবমান হতে পারতো, তাদের একটি অংশ উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে ওয়াজের আয়োজন ও সংগঠনে জড়িত। সত্যিকার দায়ী ইলাল্লাহ ও আহলুল্লাহ আলেমদের তত্তাবধান ও নির্দেশনায় তা মন্দপ্রবনতা থেকে মুক্ত হোক ।

বিনোদনের উদ্দীপনা ইখলাসের দাবির কাছে পরাজিত হোক। জাতীয় কল্যাণ ও শুভবোধ নিশ্চিত করণে ওয়াজ হয়ে উঠুক শুদ্ধির সরোবর। যেখানে হৃদয় ও জীবনের কালো দাগগুলো ধুয়ে মানবতা ফিরে পাবে চিরন্তন পবিত্রতা ।

লেখক : কবি ও কলামিস্ট

ad

পাঠকের মতামত

Comments are closed.