176754

ওয়াজ মাহফিল: বাঙালী ঐতিহ্যের প্রাণ

কাওসার আইয়ুব।।

বাংলাদেশ। মুসলিম ঐতিহ্যের দেশ। বিশ্বের মানচিত্রে লাল সবুজের এই ক্ষুদ্র দেশটির সঙ্গে মিশে আছে ১৮ কোটি মানুষের বন্ধন। এ দেশের মানুষ ইসলাম পেয়েছে সোনালী যুগের সাহাবাদের থেকেই। দেশ ও মানুষের বক্ষে সঞ্চিত ইসলাম লালিত হয়েছে যুগের পর যুগ, শতাব্দির পর শতাব্দি। কালের পরিক্রমায় ইসলাম মিশে গেছে এ দেশের মাটি, মানুষ ও আলো বাতাসের সঙ্গে। মিশে গেছে প্রতিটি স্থান, প্রতিটি কাল ও সংস্কৃতিতে।

আহারে-অনাহারে মোল্লা-মুনশিরাই প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় ‘ইসলামের জ্ঞানাদর্শ’ পৌঁছিয়েছেন। মদিনার নীতি-আদর্শ পেয়ে বিবাদ ভুলে ভ্রাতৃত্বের মর্মকথা বুঝতে শিখেছে বাঙ্গালী জাতি। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সম্প্রীতি এবং সংখ্যালঘুদের প্রতি দয়াদ্রতার শিক্ষা পেয়েছে ইসলামের মাধ্যমে।

ইসলাম ভদ্রতা ও মহাত্বতা দেখিয়েছে আচারবিধী ও দায়িত্ব পালনে। ইসামের শোভা সৌন্দর্য সমুজ্জল হয়েছে প্রতিটি কাজে এবং কর্মে। দিবা-রাত্রির গন্ডিতে আবদ্ধ ক্ষুদ্র জীবনের পরিক্রমাকে হিরা খন্ডের চেয়েও বেশি মূল্যায়ন করেছে ইসলাম। কালজয়ী ইসলাম জয় করে নিয়েছে শত কোটি মানুষের প্রাণ।

শীত মৌসুমের মাহফিলগুলো এরই উজ্জ্বল উপমা। ধর্মীয় এ সমাবেশ বাংলার প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃিতির সম্প্রসারিত রূপ। এ মাহফিলগুলো ঐতিহ্যকে ধারণ করে আছে দীর্ঘ সময় ধরে। পুরাতত্ব ও পুরাসভ্যতার মূর্ত প্রতিক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যুগের পর যুগ। সরল সহজ মানুষগুলো মাহফিলের শিক্ষাকে আগামী জীবনের অমূল্য পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। ধর্মগুরুদের কথামালাকে মনে প্রাণে গেঁথে রাখতে চায় জীবনের সাথে।

কুরআনে কারীমের তাফসীর, হাদিসের ভাষণ, জ্ঞানীদের নসিহত, নিতান্তই মধুময় লাগে একজন ঈমানদারের কাছে। ইসলামী ইতিহাস, ঐতিহ্য, অলৌকিক ঘটনা অন্তরের সুপ্ত ঈমানকে দ্বীপ্তিময় করে তোলে দিনের আলোর মত। লক্ষাধিক নবীদের জীবন চরিত খাঁটি মুমিনের ঈমানী ত্যাগের ঘটনা বাড়িয়ে দেয় ঈমানী চেতনাকে। সেই চেতনা নিয়েই বেঁচে থাকে প্রতিটি মুসলমান। বেঁচে থাকে প্রতিটি মানুষ। ইসলামের মহান এই শিক্ষা ছড়িয়ে পড়ুক সর্বময়। এ তামান্না তাদের অন্তরে।

এ দেশের মানুষ অন্ধকার রাতে জলপথ পেড়িয়ে স্থলপথের বাধা কাটিয়ে মাহফিল শোনার আগ্রহ রাজপথে ডাকঢোল পিটিয়ে যাত্রা করে প্রকাশ করে না। শীতের রাতে কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া থেকে, ছামিয়ানার নিচে চাঁটাইয়ে বসে চাদর মুড়ি দিয়ে মধুর কন্ঠে বয়ান শোনা গ্রামীণ মানুষের কাছে অনেক অনেক প্রিয়। মধুময় ও অমৃত। আদ্র মাটির উপর বিছানো খড়কুটায় বসে বসে ওয়াজ শুনে শীতের রাতের অর্ধাংশ পার করে দেয়ার আয়োজন অনেক আগ থেকেই শুরু হয় তাদের।

কুয়াশাঘন রাতে গাছের পাতাগুলো যেমন ভাষ্পকুয়াশায় সিক্ত হয়ে উঠে তেমনি শ্রোতাদের প্রতিটি হৃদয় বক্তাদের মিষ্ট বয়ানে উজ্জল সজীব হয়ে উঠে। অধির আগ্রহের পর কাঙ্খিত বক্তার কথারাশি শ্রোতারা মনের কানে শুনে এবং যত্রতত্র বলে বেড়ায়।

অন্ধকার চিরে বয়ানের ধ্বনি সুভাশিত করে গ্রামের পর গ্রাম। মুখরিত হয় রাতের প্রকৃতি। পুরো মহল্লায় ছেয়ে যায় রবরব পরিবেশ। গুঞ্জরিত হয় প্রতিটি গাছে গাছে, পাতায় পাতায়, প্রতিটি ঘরে ঘরে, হৃদয়ে হৃদয়ে।গ্রামকয়েক দূরে আত্মীয় বাড়ি ওয়াজ হলে, দু’এক দিনের জন্য বেড়াতে চলে যাওয়া, নিয়ে আসে আলাদা এক প্রফুল্লতা৷

তবে সর্বজনীন কল্যাণকর এই মাহফিলগুলো অনেকেরই গাত্রদাহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বয়ানের আওয়াজ তাদের কানে বিষাদের লাগে। ধর্মের কথা শুনে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে তাদের ভেতর বাহির। মুসলিম অধ্যুষিত দেশে এমন আগাছাদের জন্মানো দূষণীয় লাগে আমার কাছে।

সর্বময় সূর্যের আলোয় দিনকানা চামচিকার মুখ কালো করাতে সূর্যের যেমন কোন ক্ষতি নেই, ইসলামের হিংসুকদের চেঁচামেচিতে বাঙালি ঐতিহ্যের গায়ে কোন আচড় ফেলবে না ইন-শা-আল্লাহ্।

মুসলিম ঐতিহ্য অমর ঐতিহ্য। মা ও মাটির প্রতিটি অঙ্গের সাথে মিশে আছে মুসলিম ঐতিহ্য। ঐতিহ্যের দেশ। আমার দেশ। চির বহমান হোক সুধাময় মাহফিল।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইফতা বিভাগ, জামিয়া আরাবিয়া মাদানিয়া, যাত্রাবাড়ি, ঢাকা। 

আরএম/

ad

পাঠকের মতামত

Comments are closed.