177242

দিরিলিস আরতুগ্রুল যে কারণে আকাশচুম্বী দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে

বেলায়েত হুসাইন ।।

ইসলামি ইতিহাস নির্ভর বহু সিনেমা ও সিরিজ এর আগেও নির্মিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। মহানবী সা. থেকে শুরু করে খুলাফায়ে রাশেদা এবং তৎপরবর্তী ইসলামি খেলাফত ও সালতানাতকে উপজীব্য করে নির্মিত সিনেমা ও সিরিজ বেশুমার। এমনকি রাসূল সা. এর পূর্ববর্তী বিভিন্ন নবী ও রাসূল সা.-দের জীবনী ভিত্তিক সিনেমার সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। তবে দর্শকদের চাহিদার ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সব সিনেমা ও সিরিজকে ছাড়িয়ে গেছে দিরিলিস আরতুগ্রুল।

দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ সময়ে প্রতিষ্ঠিত সবশেষ ইসলামি খেলাফত উসমানী সাম্রাজ্যের উত্থান নিয়ে তৈরি এই সিরিজ-জ্বরে আক্রান্ত গোটা মুসলিম বিশ্ব! বিশেষকরে মুসলিম যুবকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে দিরিলিস আরতুগ্রুল। ইসলামি সব সিরিজ-সিনেমাকে টপকে আরতুগ্রুল গাজী এবং তার জীবনী নির্ভর সিরিজ দিরিলিস আরতুগ্রুল কেন এতো দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে?

আরতুগ্রুল গাজীর প্রতি মুসলিম বিশ্বের আত্মিক এই আকর্ষণের কারণ অন্যকিছু ন ; বরং যৌবনের অসীম সাহসিকতা এবং কঠিন বীরত্ব। যোগ্য নেতৃত্ব শূন্যতা মুসলিমদের মনকে যখন হতাশায় ডুবিয়ে রেখেছিল, ঠিক তখনই এশিয়ার মালভূমিতে যাযাবর জীবনযাপনকারী ছোট্ট কা’য়ী গোষ্ঠীর নেতা সুলাইমান শাহ ও হায়েমে হাতুনের ঘর আলোকিত করে একাদশ শতাব্দীর শেষ লগ্নে জন্ম নেন আরতুগ্রুল।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শক্তি সাহসিকতা ও আধ্যাত্মিকতায় সম্পূর্ণ হয়ে ওঠেন তিনি। পিতা সুলাইমান শাহ-ই মূলত তার চিন্তামগজে বীরত্ব আর ঈমানী জযবার বীজ রোপণ করেন। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরই গোত্রপতি পিতা সুলাইমান শাহ-এর সেনাবাহিনীর প্রধান যোদ্ধা হিসেবে নির্বাচিত হন।

তৎকালীন সময়ে তাদের নিকটবর্তী থাকা সেলজুক সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন সুলতান আলাউদ্দিন কায়কোবাদ সেলজুকী। এসময় অর্থাৎ ১২২৪ ঈসায়ী সালে চেঙ্গিস খান এক বিরাট বাহিনী প্রেরণ করেন সেলজুক রাজধানী কোনিয়া দখল করার জন্য। অপরদিকে চেঙ্গিসের মঙ্গলীয় বাহিনীর তুলনায় সেলজুকদের বাহিনী ছিলো খুবই দুর্বল ও ভীত!

এইখবর সুলাইমান শাহের কানে আসা মাত্রই তার প্রধান সেনাপতি আরতুগ্রুল গাজীকে ডেকে আদেশ করেন- হে বীরযোদ্ধা তোমার শাহাদাতের পেয়ালা পানের সুযোগ এসেছে-যে মঙ্গলীয়রা ইতিমধ্যে মুসলিম বিশ্ব কার্যত ধ্বংসই করে ফেলেছে, সেইসব কাফিরদের বিপক্ষে এবং মুসলিম ভাইদের সহযোগিতায় তোমাদের পাশে দাঁড়ানো আবশ্যক।

কায়ী গোত্র প্রধান পিতা সুলাইমান শাহ-এর আদেশমতো মাত্র ৪ শ’ ৪৪জন সৈন্য নিয়ে আরতুগ্রুল গাজী মঙ্গলীয়দের বিপক্ষে লড়াই করার জন্য রওনা করেন। পরবর্তীতে দুর্বল সেলজুকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ময়দানে কালিমার পতাকা উড্ডীন করেন। বলতে গেলে আআরতুগ্রুল ও তার সহযোদ্ধাদের বিপুল বীরত্বে মাত্র কয়েকশ যোদ্ধা বিশাল মঙ্গলীয় বাহিনীকে ধরাশায়ী করে ময়দান থেকে পালাতে বাধ্য করে।

সেলজুক সুলতান আলাউদ্দিন কায়কোবাদ তাদের এই বিজয়ে আরতুগ্রুলকে বদরের ফেরেশতা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এরপর সেলজুকদের হারানো সুগুত, নাইটদের দখলকৃত বিভিন্ন দূর্গ আরতুগ্রুল গাজীর নেতৃত্বে উদ্ধার হতে থাকে।

আরতুগ্রুলের বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে সুলতান আলাউদ্দিন পুরস্কার স্বরূপ যাযাবর কায়ী গোষ্ঠীর জন্য আনাতোলিয়ার সুগুতে একটি জায়গাও বরাদ্দ দেন। পরবর্তীতে এই সুগুত-ই উসমানী সাম্রাজ্যের প্রথম রাজধানীর স্বীকৃতি পায়। তুর্কি বীর আরতুগ্রুল গাজী ছোট্ট একটি বসতির নেতৃত্ব দিয়ে এভাবেই বিশাল এক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ভিত রচনার সূচনা করেন।

সুগুত নগরীতে ইনসাফ, ন্যায়বিচার ও সহনশীলতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলেন নতুন একটি সভ্যতা-এক্ষেত্রে তিনি তার পরবর্তী প্রজন্মকে নিজের বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা, ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের কঠোর প্রশিক্ষণ প্রদান করে রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্য করে গড়ে তোলার মহৎকর্ম আঞ্জাম দেন।

আর এই সব বিষয় ‘দিরিলিস আরতুগ্রুল ‘এ পরিচালক মুহাম্মাদ বোজদাগ অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। পর্দায় ফুটে ওঠা যুবক আরতুগ্রুলের অসীম সাহসীকতা ও বীরত্ব মুসলিম যুবকদের অন্তরে দুর্দান্ত প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে। একসময় আরতুগ্রুলের মৃত্যুর পর তারই কনিষ্ঠ পুত্র উসমান প্রথম পিতার যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে কায়ী গোষ্ঠীর নেতৃত্ব লাভ করেন এবং ১২৯৯ সালে উসমানী সাম্রাজ্যের ঘোষণা প্রদান করেন।

তাছাড়া, আরতুগ্রুল গাজীর জনপ্রিয়তার আরেকটি প্রধানতম কারণ হল তার আধ্যাত্মিকতা। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তৎকালীন জগৎবিখ্যাত সুফী ও পীর শায়েখ মুহিউদ্দিন ইবনুল আরাবি (১১৬৫-১২৪০) এর নির্দেশনা পূর্ণাঙ্গরূপে অনুস্মরণ করতেন। তিনি কখনো হতাশ হতেন না বরং কোন প্রতিকূল পরিবেশের সম্মুখীন হলেই ইবনে আরাবির স্বান্নিধ্যে যেতেন এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার পরামর্শ মেনে চলতেন।

ঐতিহাসিক এই ড্রামা সিরিয়ালে আরতুগ্রুলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন এনজিন আলতান দোজায়তান-তার অনবদ্য অভিনয়ও দিরিলিস আরতুগ্রুল দর্শকপ্রিয়তা পাওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। এক কথায় দর্শক যখন দিরিলিস আরতুগ্রুল দেখতে বসেন নিঃসন্দেহে তার অনুভূতি এমনই হয় যে, সে যেন হাজার বছর আগের সেই বাস্তব ইতিহাসই স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করছেন।

মুসলমানদের বিজয়গাঁথা ইতিহাস, তাদের জাতিসত্ত্বার অসীম ত্যাগ কিছুটা উপলব্ধি করা যায় এটা দেখে। ছোট্ট মুসলিম গোষ্ঠীটি মহান রবের রহমত আর তাদের যোগ্যতা বলে সাত শ’ বছর তিনটি মহাদেশ শাসন করেছে, ইতিহাসের সাথে মিল রেখে করা সিরিজটিতে “ইতিহাসের উজ্জ্বল তারকা গাজী আরতুগূল বে” র নেতৃত্বে তুর্কী মুসলিমদের যে উত্থান হয়েছিলো তাই-ই চমৎকৃতভাবে দৃশ্যপাত করা হয়েছে দিরিলিস আরতুগ্রুলে। একইসঙ্গে তুর্কী মুসলিমদের আত্নপরিচয়ের, হারানো ইতিহাসের স্বরূপ সন্ধানও এতে করা হয়েছে।

নারী চরিত্র রেখেও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অশ্লীলতাকে এড়িয়ে গিয়েছেন পরিচালক। আগের সিনেমা-সিরিজগুলো মূলত এখানেও দিরিলিস আরতুগ্রুলের আঁড়ালে চলে গেছে। সর্বোপরি বলা যায়, বিতর্কহীন ঐতিহাসিক একটি সিরিজ হচ্ছে ‘দিরিলিস আরতুগ্রুল’। এর জনপ্রিয়তা দিনদিন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তুর্কি প্রেস জানিয়েছে, এরদোগান সরকারের সহযোগিতায় নির্মিত এই সিরিজের শুটিং সেটে অন্তত ২৫ টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ঘুরতে গিয়েছেন। আরও অবাক করা বিষয় হল, শুটিং সেটে এসে আরতুগ্রুল গাজীর জীবনী সম্পর্কে জানার পরে একজন খৃষ্টান ইসলাম গ্রহণ করেছেন।

গতকালের খবর- দিরিলিস আরতুগ্রুলের প্রতি প্রভাবিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন এক মেক্সিকান দম্পতি।যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে স্থানীয় মুসলিম কমিউনিটি আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে মেক্সিকান দম্পতি স্বেচ্ছায় মুসলিম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তাদের কালিমা পাঠ করান ‘দিরিলিস আরতুগ্রুল’ এর অন্যতম চরিত্র আব্দুর রহমানের অভিনয় করা জনপ্রিয় অভিনেতা জালাল আল।

শেষকথা,আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসলামের ইতিহাস অবিকৃতভাবে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে যতো সিরিজ নির্মিত হয়েছে, তার মধ্যে দিরিলিস আরতুগ্রুল সবচেয়ে দর্শকপ্রিয়তা ও অধিক সমাদৃত।

আরএম/

ad

পাঠকের মতামত

Comments are closed.