177339

মুক্তিযুদ্ধের গল্প; অস্পৃশ্য বিদ্রোহী

ইরেজার হাসান ।।

অসীম অকাশ জুড়ে সারাদিনের ক্লান্ত বিচরণের পর অবশেষে পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে সূর্যটি। সারাদিন পুরো পৃথিবীকে তার উত্তপ্ত আলোয় অনেক পুড়িয়েছে সে। তাই হয়তো তার ক্লান্ত আলোয় এখন আর উত্তাপ নেই। বাঁশ ঝাড়ের বাশঁগুলোর প্রতিটি পাতার অনড় অবস্থান দেখে স্পষ্ট বলে দেয়া যাচ্ছে বাতাসের কোন উপস্থিতি নেই। পরিবেশটা একদম থমথমে।

কৃষ্ণচূড়া ফুল আমার খুব পছন্দের। পুকুর ঘাটে বসে কৃষ্ণচূড়ার উপর ছোট ছোট পাখির খেলা দেখছি। হঠাৎ করেই বাঁশগুলো নড়ে উঠল। পছন্দের দৃশ্য থেকে নজর ফিরিয়ে কৌতূহলি মনকে বেশি গুরুত্ব দিলাম। একদল লোক দৌড়ে যাচ্ছে বাঁশ ঝাড় ঘেঁষে। কেউ হাফ প্যান্ট পড়া, আবার কেউ কাছাড় দিয়ে লুঙ্গি পড়া। তবে সবার গায়ের জামাতেই অযত্নের ছাপ। আর সবার কাঁধে বা হাতে একটি করে বন্দুক। এই দৃশ্য দেখে আমি অবাক হই না। কারণ প্রতি দিনই আমি এমন দৃশ্য দেখে যাচ্ছি। তবে আমার নিয়মিত কৌতূহলটা হলো, তারা কি কাউকে ধাওয়া করছে, নাকি কেউ তাদের ধাওয়া করছে?

কৌতূহলি চোখে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। তাদের দল ছাড়া দ্বিতীয় কোন দল আমার চোখে পড়ল না। বুঝতে পেরেছি ওরা কোন দল। ওদের প্রতি আমার অকৃত্রিম সন্মান আর ভালবাসা রয়েছে। ওরা তো এগুলো পাওয়ারই যোগ্য। আমারও খুব ইচ্ছে করে ওদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঐ পিশাচদের উপর ঝাপিয়ে পড়তে, অনিশ্চিত জীবন নিয়ে এদিক ওদিক দৌড়িয়ে পিশাচদের কলিজা খুঁজে বেড়াতে। দেশ নামের মা কে বাঁচাতে এটুকু করতে কার না ইচ্ছে হবে বলুন!

কিন্তু আমি পারি না। আর এটা নিয়ে আমার মনে কষ্ট আর আফসোসের শেষ নেই। তবে আমার মনের সাধ আমি একদিনের জন্য হলেও পূরণ করবো। আর এজন্য কিছু বুদ্ধির সুতো আমার মস্তিষ্কের কাঁথায় ভাবনার সূচের স্পর্শে গেঁথে রেখেছি। আমি জানি না বাঁশ ঝাড় ঘেষে যাওয়া ঐ লোকদের ভাগ্য নদীতে আজ খুশীর তরী ভাসবে কিনা, তবে প্রতিদিন তিন বেলা খাওয়া যেমন মানুষের জন্য একটি প্রাকৃতিক নিয়ম হয়ে গেছে, ঠিক তেমনি ওদের প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ থেকে প্রতিদিন মনের গভীর থেকে ওদের জন্য দোয়া করাটাও আমার জীবনে একটি নিয়ম হয়ে গেছে।

মহানবী সা. যখন মদীনাতে হিজরত করতে যাচ্ছিলেন তখন অশ্রুভেজা চোখে তার জন্মভূমি মক্কার দিকে বার বার ফিরে তাকিয়ে জন্মভূমির প্রতি তার ভালবাসা প্রকাশ করেছিলেন। মহানবী সা. এর চোখের অশ্রু আমাদেরকে দেশপ্রেমের শিক্ষা দেয়। দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ। মহানবী সা. এর আদর্শও এটি। আমার আত্নবিশ্বাস, যারা জন্মভূমিকে শত্রুর করাল গ্রাস থেকে বাঁচাতে জীবন দিচ্ছেন এবং অমূল্য প্রাণকে বাজি রেখে শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন, তাদের এই মহান ত্যাগকে আল্লাহ বিফলে দিবেন না। সোজা পশ্চিমে গম ক্ষেতের দিকে আমি তাকিয়ে থাকলাম ততক্ষণ, যতক্ষণ ওদের অস্তিত্ব আমার চোখের নির্দিষ্ট সীমানায় বিলীন না হয়ে যায়।

ওরা চলে যাওয়ার পর আমি আবার কৃষ্ণচূড়ার উপর ছোট পাখিদের বিচরণ দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। মায়ের কড়া শব্দের ডাকে আমি ঘরে ফিরে এলাম। প্রতিটি মানুষই ঘরে এসে নিরাপদ বোধ করে। প্রিয় মানুষদের মুখ দেখে অন্তরে শান্তির বাতাস বয়ে যায়। আমার বেলায়ও তার ব্যতিক্রম হয় না। দেশের জন্য যারা যুদ্ধ করছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধার দালানটি আরো কয়েক তলা বেড়ে যায় তখন, যখন দেখি তারা পরিবারের সব সদস্যদের মায়া ত্যাগ করে দেশ আর দেশের মানুষের স্বার্থে যাযাবরের মত জীবন যাপন করছেন। আমাদের বাড়িতে ঘর একটি কিন্তু জগৎ দুইটি। দুইটি জগৎ বলতে দুইটি রুমকে বুঝাচ্ছি। মানে দুই রুমে দুই জগৎ। দুই জগৎ বলারও একটি উপযুক্ত কারণ আছে। এক রুম হচ্ছে মানুষের বসবাস যোগ্য, আর অন্য রুমটি পিশাচদের আড্ডাখানা। বুঝতেই তো পারছেন পিশাচ পাকিস্তানিদের বলছি। তাই বলে এটা ভাববেন না আমরা পাকিস্তানি। বলতে ঘৃণা লাগলেও সত্য প্রকাশে আমি আপোসহীন। আমার বাবা একজন রাজাকার। আর সেই সুবাদে পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের ঘরের ঐ রুমে সলাপরামর্শ করে। আর আমার বাবা এ বিষয়ে ওদের সহযোগিতা করে। সত্যি বলতে তাকে বাবা বলতে আমার ঘৃণা হয়। তবুও পৃথিবীর যৌক্তিক নিয়ম অনুসরণ করে তাকে বাবা বলতে হয়।

তবে আমার কাছে ভিন্ন জগতের ঐ আড্ডা খানার ব্যাপারে আমার মায়ের কোন দ্বিমত দেখিনি কখনও। নারীরা এই সমাজে পুরুষদের কব্জাবন্দী হয়ে আছে। মনের ভেতর অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিন্তা করতেও তাদের ভয় পেতে হয়। তাই হয়তো মা এই ব্যাপারে কিছু বলতে চায় না। তবে আমার মা অনেক সচেতন একজন নারী। তাই এই ব্যাপারে তার নিস্তব্ধতা আমাকে খুব অবাক করে। আমি এখনও বুঝতে পারি না আমার মায়ের আকাশে কোন রঙের ঘুড়ি উড়ে বেড়ায়। মা কে যখনই এই বিষয়ে কিছু বলতে যাই তখনই মা আমাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেন। পরক্ষনেই আবার মুচকি হাসতে হাসতে বলেন, ‘তুই পোলাপান মানুষ। তোর মাথায় এত কিছু ধরবে না। কথা না বলে পোলাপানের মতোই চুপ করে থাক।

মা হয়তো ভুলে গেছেন, পোলাপানরা নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি বেশি কৌতূহলি থাকে। আর পোলাপানরাই মাঝে মাঝে এমন কিছু করে ফেলে যা একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষকে অবাক করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। তবুও মায়ের মুচকি হাসির রহস্য মনে রেখেই আমি চুপ থেকে যাই। আর প্রতি রাতেই একজন বাঙালির ঘরে উর্দু ভাষার অসহ্য অত্যাচার আমার বাঙালি কানে সহ্য করে ঘুমিয়ে পড়ি। প্রতিদিন ভোরে উঠে নামাজ পড়াটা আমার মায়ের কাছে শেখা একটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আমার বাবাও নিয়মিত নামাজ পড়েন। তিনি মসজিদে চলে গেছেন নামাজ পড়তে। আমার কোন ভাই বোন না থাকায় আমি খুব নিয়মের দড়ি বেয়েই জীবন আকাশের দিকে উঠেছি। নিয়মানুবর্তিতা আমারও ভাল লাগে। পুরো পৃথিবীটাই যেহেতু নিয়মের উপর চলে তাহলে নিজের মাঝে অনিয়ম থাকাটা খুবই বেমানান। নামাজ শেষ করে আমার ছোটবেলার সৌখিন জিনিসের কাছে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ সময় দেই।

আমার ছোটবেলা থেকে এখন পর্যন্ত কবুতরের সাথে সময় কাটাতে ভাল লাগে। কবুতর পালাটা আমার সখ বলতে পারেন। যদিও আমার জীবনে ভালবাসা নামের আকাঙ্খিত বস্তুটি এখনো আসেনি, তবুও পায়রা আর পায়রীর ভালবাসা আমাকে মুগ্ধ করে। আমি কবুতরদের খাবার দিচ্ছি, এমন সময় কয়েকজন লোক দৌড়ে এসে দাঁড়ালো আমাদের বাড়ির উঠানে। কবুতরগুলো নিজেদের ভাষায় ডাকতে শুরু করল আর আমি আতঙ্কিত হয়ে দৌড়ে মায়ের কাছে চলে এলাম। আমার মাঝে অস্থিরতা দেখে মা কৌতূহলি চোখে এগিয়ে এল উঠানোর দিকে। ‘ভয় পাবেন না খালাম্মা। আমরা মুক্তিবাহিনী। আমরা আপনাদের পাশের গ্রামে ঘাটি গড়েছিলাম কিন্তু পাক বাহিনীরা ঐ ঘাটির খবর পেয়ে গেছে। তাই আমরা আপনাদের গ্রামে নতুন ঘাটি গড়তে চাচ্ছি।’

বন্দুক কাঁধে নিয়ে হাপাতে হাপাতে কথাগুলো বলছে ছেলেটি। ওদের সবার গায়ের কাপড়ে অযত্নের ছাপ। গাল মুখ ভাঙা। চুলগুলো এলোমেলো। দেখেই বুঝা যায় নিজের দিকে তাকানোর সময় পায় না ওরা। আর দেশের এই অবস্থায় নিজের খেয়াল নিবেই বা কি করে! এখানে যে নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন। অস্তিত্বই যদি না থাকে তাহলে সৌন্দর্যের কথা তো ভাবাই যায় না। তাই আগে দেশ বাঁচাতে হবে। তাহলেই তো সৌন্দর্যের কথা ভাবা যাবে।

দেখ বাবা, এদিকে পাক বাহিনীর আনাগোনা আছে। তোমরা বরং ঐ খালের ঐ পাড়ে গিয়ে ঘাটি গড়ো। ঐদিকটা নিরাপদ আছে। আমার জানা মতে পাক বাহিনীদের ঐদিকে কোন কৌতূহল নেই।’

মায়ের ভালবাসাপূর্ণ উওর আমাকে অবাক করে দিলো! আমার বাবাই তো মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে কথা বলে। আর মা ও তাতে নীরব সম্মতি দেয়। আর মা ই আজকে ওদের নিরাপদ স্থানের কথা বলে দিচ্ছে! মা’র দ্বিমুখী চরিত্রকে মেনে নিতে কষ্ট হলো আমার। আচ্ছা, এতে মা’র কোন মতলব নেই তো! মুক্তিবাহিনীদের দিকে তাকিয়ে একটি অনিশ্চিত বিপদের আশঙ্কা হলো আমার।

‘ধন্যবাদ খালাম্মা! দয়া করে আমাদের এখানে অবস্থানের কথা কাউকে বলবেন না। খালাম্মা! খুব পিপাসা পেয়েছে। একটু পানি খাওয়াবেন?’

ওদের তৃষ্ণার্ত কথা শুনে মা’র অনুমতির তোয়াক্কা না করে কল পাড় থেকে এক জগ ঠাণ্ডা পানি নিয়ে গেলাম ওদের কাছে। জগ আর গ্লাস এগিয়ে দিতেই মুচকি হাসিতে আমাকে কৃতজ্ঞতা জানালো। ওরা যখন পানি খাচ্ছিলো তখন ওদের গলা বেয়ে কিছু পানি বুকের কাছে গড়িয়ে পড়ছিল। বুঝতে পারছি ওদের হাতে সময় কম। তাই এত তাড়াহুড়ো করছে। পানি খাওয়া শেষে ওদের তৃপ্তির মুখটা দেখে খুব ভাল লাগলো। যার হাতে জগ আর গ্লাসটি দিয়েছিলাম সে আমাকে জগ আর গ্লাস ফিরিয়ে দিয়ে আমার দিকে কিছু সময় তাকিয়ে রইল।

আমি মুখ ঘুরিয়ে নিতেই সে বলে উঠল, ‘আপনাকে অনেক ধন্যবাদ! খালাম্মা! আমরা যাই তাহলে!’ বলেই তাড়াহুড়ো করে তারা চলে গেল। তাদের পিপাসা মেটাতে পেরে আমার খুব ভাল লাগছে। কত মা’র সাহসী সন্তান একত্রিত হয়েছে দেশ নামক তরীর স্বাধীনতার হাল ধরতে। ইস্! আমি যদি ওদের একজন হতে পারতাম!

আফসোস হয় খুব আমার। কিন্তু কিছু করার নেই। তবে এটিও আমার স্বপ্ন আমি দেশের জন্য কিছু করার সুযোগ পেলে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে হলেও সেটি করবো ইনশাআল্লাহ্!

প্রতি রাতের মত আজকে রাতেও আমাদের পাশের জগতে পিশাচদের অট্টহাসির মহড়া চলছে। উর্দু ভাষা স্বল্প ধরতে পারি আমি। আমি আজ ইচ্ছে করেই ওদের কথাগুলো খেয়াল করছি। উর্দু ভাষা আমার কানে অত্যাচারের মতো লাগে অথচ আজ ইচ্ছে করেই সেই অত্যাচার মাথা পেতে নিচ্ছি কেন, তাইতো? আমি জানতে চেষ্টা করছি আজ সকালে যারা এসেছিল ওদের কথা মা বাবাকে বলেছে দিয়েছে কিনা। মা যদি বাবাকে বলে থাকেন তাহলে বাবা অবশ্যই পিশাচদের কাছে তা বলে দিবে। আর পিশাচরা তখন মুক্তিবাহিনীদের উপর অতর্কিত আক্রমন করে বসবে। সত্যি যদি এমনটা করতে চায় তাহলে আমি এটা হতে দিবো না। আর এজন্যেই উর্দু ভাষার অত্যাচার নিজ কানে সহ্য করছি। কিন্তু পিশাচদের কথাবার্তায় তেমন কিছু পাচ্ছি না। বোধ হয় ওদের কোন নতুন কমান্ডার এসেছে আমাদের এলাকায়, তেমন একটি কথাই ভেসে আসলো আমার কানে। ঐ কথার পর পরই গম্ভীর ভারী একটি কন্ঠের কথা শোনা যাচ্ছে। সবাই চুপ করে আছে। তার কথা খেয়াল করে বুঝতে পারছি তিনি এখানকার মানুষদের উপর খুব ক্ষুব্ধ। কারণ এই অক্টোবর মাস পর্যন্ত তাদের প্রায় ৬০০ জন সৈন্য মৃত্যুবরণ করেছে আমাদের এলাকায়। তিনি সন্দেহ করছেন তাদের সৈন্যদের মধ্যে কেউ একজন বেঈমান আছে। যিনি এই ব্যাপক মৃত্যুর জন্যে একমাত্র কারণ। আর এই এলাকায় নিয়োজিত সৈন্যদের মধ্যে সবচেয়ে পুরনো একজন সৈন্যকে উদ্দেশ্য করে কিছু হুশিয়ারী মূলক কথা বললেন তিনি। কারন ঐ সৈন্যের সহযোগী সবাই মারা গেলেও শুধু তিনিই এখনও বেঁচে আছেন। কমান্ডারের সন্দেহের তীরটা তাই ঐ সৈন্যের দিকেই তাক করা।

সবগুলো কথা বুঝতে পারছিলাম না আমি। তাই তাদের কথার প্রতি মনযোগটাও কমে আসছিল। এক সময় অন্য খেয়ালে চলে গিয়েছিলাম আমি। যখন নিজের মাঝে ফিরে এলাম তখন খেয়াল করে দেখলাম পাশের জগতটি একদম নিস্তব্ধ। বুঝতে বাকি রইলো না পিশাচের দল এখন চলে গেছে। বেশ কিছুদিন এভাবেই কেটে গেল। অসহায় নির্দোষ বাঙালিদের লাশের মহড়া দেখতে প্রতিদিনই পাশের গ্রামে যায় পিশাচদের কমান্ডার। আর কত লাশ তারা চায় সেটি কারো জানা নেই। তাদের উদ্দেশ্য একটাই, আমাদের সোনার বাংলা দখল করবে। সেটি যে কোন কিছুর বিনিময়ে হোক। হাজার হাজার দুধের শিশুর বুক বুলেটের আঘাতে ঝাঝড়া হয়ে যাচ্ছে, চলার ক্ষমতাহীন বৃদ্ধ লোকজন কাতোর কণ্ঠে প্রাণ ভিক্ষা চেয়েও তার মাথার অস্তিত্ব সমান রাখতে পারছে না এতে তাদের কিছু যায় আসে না।

যেভাবেই হোক, তারা তাদের নির্দয় হাসিতে বাঙলার আকাশ বাতাসকে ভারী করতে চায়। আর তাদের এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে আমাদের সাহসী বাঙালিরা। প্রতি রাতের মত সেদিন রাতেও আমি আমার রুমে ঘুমিয়েছি। বাবা মা পাশের রুমে ঘুমায়। উর্দু ভাষার চিল্লা চিল্লিতে আমার ঘুম ভেঙে গেল। সাধারণত এত রাতে পিশাচের দল কখনো আমাদের বাড়িতে আসে না। তাদের কথাবার্তা তাদের আচরণে হঠাৎ করেই আমূল পরিবর্তন লক্ষ করলাম। ওরা আমার বাবাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করছে। টিনের বেড়ায় বার বার কেউ ধাক্কা খাচ্ছে মনে হচ্ছে। মা কেঁদে কেঁদে বিরতিহীন চিৎকার করে যাচ্ছে। আর পিশাচরা অবিরত গালাগালি করে যাচ্ছে।

এত রাতে হঠাৎ এমন অবস্থার জন্য আমি কোনভাবেই প্রস্তুত ছিলাম না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে এক মুহূর্ত বসে রইলাম বিছানায়। বুঝতে পারছিলাম এখন ঐ রুমে গেলে ওদের রোষানলে পড়তে হবে। আর এখানে বসে থাকাটাও নিরাপদ হবে না। তাই আমি আমার রুমের দরজাটা আস্তে করে খুলে বাইরে বেড়িয়ে এলাম। খুব সাবধানে ঘরের পিছনের দিকে চলে গেলাম। আমার উদ্দেশ্য হলো ওরা আসলে কি করছে তা আধখোলা জানালা দিয়ে দেখা। কিন্তু আমি জানালায় চোখ রাখার আগেই কয়েকটা গুলির শব্দ উড়ে আসল আমার কানে। আমি ঐখানেই স্থির হয়ে গেলাম। অনিশ্চিত ভয়ের অনুভূতি প্রবাহিত হলো আমার শিড়দাড়া দিয়ে। সেই অনিশ্চিত ভয়ে দাঁড়ানোর শক্তি টুকু হারিয়ে ফেলেছি আমি। খেয়াল হচ্ছে না কি করছি আমি, তবে যখন দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম তখন দেখলাম আমার পা দুটো কাঁপছে।

মরুভূমিতে কিছু সময় কাটানোর পর পিপাসায় যেমন গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায় ঠিক তেমন করে আমার গলাটি শুকিয়ে আসছিল। আমি বুঝে ফেলেছি ঘরের ভিতরে কি হয়েছে। তবুও চোখের বিশ্বাস অর্জনের জন্য কাঁপা কাঁপা পায়ে দাঁড়িয়ে খুব সাবধানে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। নিজের অজান্তেই মনে মনে ভাবছি, আল্লাহ্! আমার ধারণা যেন ভুল হয়! অবশেষে অজানা ভয় নিয়ে জানালার এক কোণা দিয়ে ভিতরের অবস্থা দেখতে চোখ মেললাম। ভাগ্য কখনো আমার দিকে সুপ্রসন্ন হয় না। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। পিশাচের দল আমার বাবার দাড়িগুলোকে তার বুকের রক্তে রাঙিয়ে গেছে। আমার মা’র ফিরোজা রঙের কাপড়টি তাজা রক্তে ভিজে জবজব করছে। তাদের শরীর এখনও একটু একটু কাঁপছে।

দুজন জলজ্যান্ত মানুষের কাছে থেকে মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর আলো বাতাস কেড়ে নিল ওরা। দৃশ্যটি দেখার পর আমার গায়ে শক্তি পাচ্ছিলাম না। কোন একজনের জোরালে কাশির শব্দে আমার ঘুম ভাঙল। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখলাম একটি কাপড়ের ছাউনি আমার উপর। আমি মাটির বিছানায় একটি কাপড়কে চাদর করে শুয়ে আছি। আমি উঠে বসতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু শক্তিহীনতার কারনে উঠে বসতে আমার অনেক কষ্ট হলো। কিন্তু আমি এখন কোথায় আছি সেটাই তো বুঝতে পারছি না। এমন সময় গলা কাশি দিয়ে এসে আমার পাশে এসে বসলো। তার মুখটা আমার খুব চেনা চেনা লাগছে। মনে হচ্ছে আগে কোথাও দেখেছি। গভীর মনযোগ সহকারে মনে করতে চেষ্টা করছি কিন্তু কোন লাভ হচ্ছে না। অবশেষে সেই আমার ব্যর্থ ভাবনার কাঁচটি ভেঙে দিলো, ‘এমন সময় আপনাকে কি বলে সান্ত্বনা দিবো তা আমি নিজেও জানি না। শুধু বলবো, এটাকে প্রকৃতির নিয়ম হিসেবেই মেনে নিন। মনে সাহস সঞ্চয় করুন। আপনার বাবা মা’র মত সব নির্দোষ বাঙালিদেরই তো অনবরত মেরে চলেছে ওরা। কিন্তু আমরা ওদের ছাড়বো না। আমরা ওদের কাছে হারবো না ইনশাআল্লাহ্!’

বলেই আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষন। এই স্থির চাহুনি আমার খুব পরিচিত লাগছে। কিন্তু মনে করতে পারছিনা কেন! তার কথা শুনে আমার মনে কিছু কথা জমা হয়ে গেল, আমার বাবা তো নির্দোষ ছিলেন না। বাবা তো তাদের হয়েই কাজ করতেন। তাদেরকেই প্রতিদিন আমাদের বাড়িতে আপ্যায়ন করতেন। তাদের খুশি রাখার জন্য বাঙালিদের অনেক তথ্য এনে দিতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা আমার বাবার সাথে বেঈমানি করলো। আর সেই বেঈমানির আগুনে আমার মা কেও পুড়তে হলো। কিন্তু কথাগুলো আমি মুখ ফুটে বলতে পারছি না তার কাছে। আমার গলায় কথা বলার মত শক্তি টুকুও আসছে না। আমি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি তার দিকে। তার মুচকি হাসির মুখটি মনে করতে পারছিনা আমি। হ্যাঁ! মনে পড়েছে! ঐদিন সকালে তাকেই তো আমি পানি খেতে দিয়েছিলাম। আমার মনে পড়েছে। তার মানে আমি এখন মুক্তিবাহিনীদের কাছে আছি।

আমি নিরাপদ বোধ করছি। অন্তত পিশাচদের নজর থেকে দূরে আছি আমি। ‘দেখুন, আমাদের যে কোন সময় বেড়িয়ে পড়তে হবে। আপনাকে একা রেখে যাওয়া উচিত হবে না। আপনি মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকবেন। আপনি তো বন্দুক চালাতে পারবেন না। আমি ঠিক করেছি আপনাকে দিয়ে একটি টোপ ফেলবো। এই টোপ কাজে লাগলে বেশ কয়েকজনকে কাবু করতে পারবো আমরা।’

অস্থির ভাব নিয়ে অনবরত কথাগুলো বলে তাড়াহুড়ো করে চলে গেলেন তিনি। কিছুক্ষণ পর একটি বাটি হাতে একজন লোক এসে বসলো আমার পাশে।

‘আপনার কেমন লাগছে এখন?’ কৌতূহলি চোখে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো লোকটি।

আমি মাথা নিচু করে নিশ্চুপ বসে রইলাম। আমার নীরবতা হয়তো সে বুঝতে পারলেন, তাই বাড়তি কোন কথা বললেন না।

এই ভাতগুলো খেয়ে নিন। আমাদের হাতে সময় কম। তাই ভণিতা না করে আপনাকে কিছু কথা বলি। আপনাকে একটি কাজ করতে হবে। পাক বাহিনীরা যৌবন পিয়াসী। ওরা আমাদের অনেক মা বোনদের ধর্ষণ করেছে। তাই আপনাকে দিয়ে ওদেরকে মারার একটি ফাঁদ বানানোর চিন্তা করেছি। ওরা যেখানে অবস্থান করে তার আশেপাশে আপনি ঘুরাফেরা করবেন। ওরা যখন আপনার প্রতি নজর দিবে তখন ওদেরকে আপনার রুপ যৌবনের লোভ দেখিয়ে আমাদের ঠিক করা জায়গায় নিয়ে আসবেন। আর ওরা জায়গামত এসে পড়লে আমরা ওদের উপর ঝাপিয়ে পড়বো। আজকে বিকেল থেকেই শুরু করবেন কাজটি। ভয় পাবেন না। ভাগ্য সাহসীদের পক্ষে। মন সাহস সঞ্চয় করুন। আপনার আমার ছোট ছোট ত্যাগ একত্রিত হয়েই অনেক কিছু সম্ভব হবে।’ কথাগুলো বলেই চলে গেল লোকটি।

এরপর কখনো গ্রামের বধূ, কখনো ছাত্রী, কখনো ক্ষেত নিড়ানির লোক সেজে বেশ কিছু পিশাচের লোভকে পাপ আর পাপকে মৃত্যুতে পরিণত করেছি। এগুলোই তো ছিল আমার স্বপ্ন! আজ ১৬ ডিসেম্বর। সারা দেশের সব জায়গায় পাক বাহিনীরা নির্ভীক মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্নসমর্পন করেছে।

কথাগুলো শুনে শরীরটা সতেজ হতে থাকলো আমার। আমিও তো এমন কিছু বুদ্ধির সুতো আমার মস্তিষ্কের কাঁথায় গেঁথে রেখেছিলাম। আমার ইচ্ছে তাহলে পূরণ হবে। আমি দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য সামান্য হলেও কিছু করতে পারব। ভাবতেই মনে নতুন শক্তি অনুভব করছি আমি। না! শুধু আনন্দিত হলে চলবে না। অস্থির না হয়ে আমাকে কাজ করতে হবে। পরের দিন সন্ধ্যাবেলা। ৫/৭ জন পিশাচ খালের পাড় দিয়ে যাচ্ছিলো। আমরা গোপন সূত্রে জানতে পেরেছিলাম ওরা এমন সময় খাল পাড় দিয়ে যাবে। তাই আমি খালে একটি নৌকা নিয়ে বসে আছি। আমাকে দেখে ওরা একজন অন্যজনের দিকে তাকাচ্ছিলো। তারপর নিজেরা কিছু কথা বলে আমার নৌকার দিকে এগিয়ে এলো। চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আমার দিকে লোভী লোভী নজরে তাকালো ওরা। আমিও গা ছাড়া ভাব নিয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে একটু একটু হাসতে লাগলাম। ওরা সবাই নৌকায় উঠে পড়ল। একজন আমার দিকে এগিয়ে এসে আমার গায়ে হাত দিলো। আমি হাতের জোর ধাক্কায় ওর হাতটি সরিয়ে দিলাম। আমার দিকে গরম নজরে তাকালো সে। আমি মুচকি হেসে ওকে ইশারা করে বুঝালাম, খালের ঐ পাড়ে গিয়ে সব হবে। ও রাজি হলো।

ওরা সবাই নৌকার মাঝখানে বসে হায়নার মত দাঁত কেলিয়ে হাসাহাসি করতে থাকলো। আর আমি নৌকাটা খালের পাড়ে নিয়ে এলাম। খালের পাশেই ছিল কয়েকটি বাঁশ ঝাড় আর গমের ক্ষেত। আমি ওদেরকে বাঁশ ঝাড়ের পাশে নিয়ে এলাম। ওদের মধ্যে একজন আমার উপর এসে ঝাপিয়ে পড়ল। আমার বুকের আঁচল সরিয়ে কুকুরের মত জিহ্বা দেখাচ্ছে আমাকে। আমি কৌশলে ওর মাথার হেলম্যাটটি খুলে ওর মাথায় সজোরে একটি আঘাত করলাম। আর সাথে সাথে জন্মভূমির মায়া মাখানো কিছু বুলেট ওদের পিশাচের শরীর থেকে দূষিত রক্ত বের করে আনল। এটাই ছিল আমার সার্থকতা।

এরপর কখনো গ্রামের বধূ, কখনো ছাত্রী, কখনো ক্ষেত নিড়ানির লোক সেজে বেশ কিছু পিশাচের লোভকে পাপ আর পাপকে মৃত্যুতে পরিণত করেছি। এগুলোই তো ছিল আমার স্বপ্ন! আজ ১৬ ডিসেম্বর। সারা দেশের সব জায়গায় পাক বাহিনীরা নির্ভীক মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্নসমর্পন করেছে। প্রায় ৩০ লক্ষ তাজা প্রাণ হনন করে শেষ পর্যন্ত অসহায় অকুতোভয় দেশপ্রেমীদের সত্য ও ন্যায্য চাওয়ার কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছে পিশাচের দল। কেউ হারিয়েছে মা-বাবা, কেউ হারিয়েছে স্বামী-সন্তান, কেউ মা-বাবা স্ত্রীসহ সর্বস্ব হারিয়েছে। আমি হারিয়েছি আমার মা-বাবা মায়া মমতাকে। আজ এই বিজয়ের দিনে আমার মা-বাবার মত লক্ষ লক্ষ অসহায় আত্না হয়তো না ফেরার দেশে বসে খুশির নিঃশ্বাস ফেলছে। তাদের সাথে আজ বাংলার মানুষেরাও মন ভরে মুক্তির নিঃশ্বাস নিচ্ছে। স্বাধীন দেশের চিহ্ন স্বরুপ সব জায়গায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়ে গেছে।

আজ এই অব্যক্ত খুশির দিনে আমার একমাত্র সম্বল মা-বাবার অনুপস্থিতিটা আমাকে খুব পীড়া দিচ্ছে। আমার মত হাজার হাজার অসহায় বাঙালি তাদের স্বজন হারানো আর স্বাধীন দেশ পাওয়ার মিশ্র অনুভূতিগুলো চোখের জলে প্রকাশ করছে। আমাদের স্কুল মাঠের একপাশে নিশ্চুপ বসে আছি আমি। মুক্তিবাহিনীদের পাশাপাশি অনেকেই এসেছে। স্বাধীন দেশের প্রতীক সবুজের মাঝে লাল সূর্যের ভেতর দেশের মানচিত্র সম্পন্ন পতাকা উত্তোলন করা হবে আজ।

‘এখানে নিশ্চুপ বসে আছেন কেন? আজ তো সব দুঃখ ভুলে খুশিতে মাতার দিন । চলুন আমাদের সাথে।’ আমার ডান পাশে থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠ ভেসে আসলো আমার কানে।

‘জানেন, আজকে আমার মা-বাবার কথা খুব মনে পড়ছে। আমি দেশের একটি শত্রুকে হলেও মারতে পেরেছি এটা ভেবে যেমন আনন্দ হচ্ছে, আমার বাবা একজন রাজাকার ছিল এটা ভেবে ঠিক তেমন কষ্টও হচ্ছে।’

আমি সরল স্বীকারোক্তি পেশ করলাম তার কাছে। ‘কি বলছেন এসব! আপনার বাবা রাজাকার হবেন কেন! তিনি তো আমাদের গুপ্তচর ছিলেন। পাক বাহিনীর সাথে রাজাকারের অভিনয় করে তাদের সব তথ্য আমাদের দিতেন। তার সুবাদেই তো আমরা অত্র অঞ্চলের বেশ কিছু পাক সেনাদের মারতে পেরেছি। পরে যেদিন ওরা আপনার বাবার গুপ্তচরের খবর জেনে যায় ঐদিন ওরা আপনার বাবা-মা কে হত্যা করে। আর আমরা এই খবর পেয়ে আপনাদের বাড়িতে গিয়ে আপনাকে অজ্ঞান অবস্থায় পেয়ে আমাদের কাছে নিয়ে আসি।’

কথাগুলো শুনে শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমি। এক মিথ্যে ধারনার বোঝা নেমে গেল আমার মাথা থেকে। এখন বুঝতে পারছি মা কেন আমার কথা শুনে মুচকি হাসতেন। তার মানে মা ও এসব জানতেন। শুধু আমিই জানতাম না।

আমার খুব গর্ব হচ্ছে তাদের নিয়ে। আমি এতদিন বাবাকে ভুল বুঝে এসেছি। আজ আমার ভুলের অবসান ঘটেছে। আমার বাবার মত আমিও মুক্তিযুদ্ধে পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছি। একজন বৃহন্নলা হয়েও নারী সুলভ আচরণ করে অনেক পিশাচদের আমার মিথ্যে যৌবনের ফাঁদে ফেলেছি।

হ্যাঁ! আমি হিজড়া! আমি তথাকথিত সমাজ ব্যবস্থার এক অস্পৃশ্য অংশ। মুক্তিবাহীনিরাও আমার এই লুকানো সত্যটি জানে না। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জন করেছি আমরা এই স্বাধীনতা। আত্মত্যাগের কিছু গল্প আমরা সবাই জানি, কিন্তু কিছু গল্প সব সময় অজানাই থেকে যাবে। আমি দৌড়ে গ্রামের স্কুল মাঠে চলে এলাম। স্বাধীন দেশে স্বাধীন পতাকা উড়ছে। আর সবার সাথে আমি গলা মিলিয়ে গেয়ে চলছি- ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি।’

আরএম/

ad

পাঠকের মতামত

Comments are closed.