178244

স্মৃতির আরশিতে মুফতী আমিনী…

তাওহীদ আদনান।।

তখন ছিলো শীতের মৌসুম৷ প্রচণ্ড শীত৷ হাড় হীম যাওয়া অবস্থা৷ শীতের এমন মারমুখী হামলা স্বাধারণত দেখা যায় না বাংলাদেশে৷ তবুও যখন নামে, মাত্রাতিরিক্ত কঠিন এক রাক্ষুসে রূপ ধারণ করেই নামে৷ শীতের এই আগ্রাসী থাবা কখনো কখনো শিরোনামও হয়ে যায় পত্রিকার পাতায়৷ খবরে ভেসে ওঠে, শীতের তীব্রতায় অমুক অঞ্চলে তমুকের ইন্তেকাল৷

আমরা তখন ঢালকানগর মাদরাসায় পড়ি৷ পরীক্ষার মৌসুম৷ সেমাহী পরীক্ষা কড়া নাড়ছে সকলের দ্বারে৷ প্রায় মাদরাসাতেই পরীক্ষার আমেজ৷ কোথাও হয়তো শুরু হয়েছে৷ কোথাও বা হবে৷ বাংলাদেশে সাধারণত একই সময়ে সবগুলো মাদরাসাতেই পরীক্ষা হয়ে থাকে৷ সে হিসেবে মোটামুটি সবখানেই চলছিলো পরীক্ষার আনাগোনা৷

ঢালকানগরে স্বাধারণত চার দেয়ালেই আবদ্ধ থাকতাম সর্বদা৷ ক্লাসরুম আর ছাত্রাবাস ছিলো ভিন্ন ভিন্ন৷ ক্লাস রুম এক প্রান্তে আর ছাত্রাবাস আরেক প্রান্তে৷ আসা-যাওয়ার জন্য ভেতর দিয়ে একটি রাস্তা থাকলেও স্বাধারণত বাহির দিক থেকেই যেতাম আমরা৷ আসা-যাওয়ার পথে একটি দোকান পড়তো৷ ওখান থেকে মাঝে-সাঝে পত্র-পত্রিকায় নজর বুলিয়ে, দেশের হাল-চালও জেনে নিতাম তখন৷

২০১২ সনের কথা৷ তখন ডিসেম্বর মাস সবে শুরু৷ বেশ কয়েকদিন যাবৎ পত্রিকার পাতায় একটি নতুন বিষয় দেখতে লাগলাম৷ সামনে নাকি ম্যাজিক ডে৷ ১২/১২/১২৷ এটা নাকি একশ বছরে একবার হয়৷ দুনিয়ার গোলকধাঁধা তখন কম বুঝতাম৷ বয়সে ছিলাম ছোট৷ ক্লাসের অন্য একজন থেকে বুঝে নিলাম ম্যাজিক ডে-এর মর্ম৷ ভালই৷ অবাক হলাম৷ মানুষ কত কিছুই না খুঁজে খুঁজে বের করে আজব এই দুনিয়ায়৷

ম্যাজিক ডে-এর অপেক্ষায় দিন গুজরান করতে লাগলাম৷ শুনতে লাগলাম দিনটিকে স্মরণীয় রাখতে নাকি কত জন কত কিছু করছে৷ কখনো হাসতাম মুখ চেপে৷ কখনো বলাবলি করতাম৷ দুনিয়ার রং তামাশায় সত্যিই অবাক হতাম৷ কী কী হয় এই রং তামাশার দুনিয়ায় শুধু অবাক নয়নে অবলোকন করে যেতাম৷

একদিন ভাবলাম আমরাও স্মরণীয় করে রাখি দিনটিকে৷ খারাপ কী? ভাবতাম আর হাসতাম৷ একজন বললো, মিয়া স্মরণীয় করে রাখবেন, সেই ব্যবস্থা তো মাদরাসা কতৃপক্ষ করে দিয়েছে৷ ম্যাজিক ডে-তে পরীক্ষা শুরু৷ অনেকভাবেই স্মরণ রাখতে পারেন৷ জীবনের সবচেয়ে ভালো অথবা খারাপ পরীক্ষা দিয়ে চিরদিনের জন্য স্মরণীয় করে রাখেন৷

এ সবই ছিলো পরস্পরে দুষ্টুমিমূলক কিছু কথা-বার্তা৷ সবশেষে সব কিছুরই উর্ধে ছিল পড়া-লেখা৷ ১২ তারিখ থেকে পরীক্ষা৷ অল্প কয়েকদিন বাকী৷ খেয়ার দেয়নি তখনো৷ খুব মেহনত করতে হবে৷ সবকও চলছে৷ ফাঁকে ফাঁকেই প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে৷ খেয়ার হবে পরীক্ষার ছয়-সাতদিন আগে৷ মূল প্রস্তুতি আগেই নিয়ে নিতে হবে৷

দেখতে দেখতে দিনগুলো ফুরিয়ে আমরা পরীক্ষার দ্বারপ্রান্তে৷ ১১ তারিখ সেদিন৷ রাত পোহালেই পরীক্ষা শুরু৷ গভীর রাত পর্যন্ত চলতে থাকলো অধ্যবসায়৷ শীতের তীব্রতা পড়া-লেখার সামনে যেনো কাবু প্রায়৷ প্রচণ্ড শীত হওয়া সত্বেও গভীর রাত পর্যন্ত পড়েই তারপর বিছানায় এলাম৷ রাত ১২ টা পেরিয়ে গেছে৷ তখনো ঘুমোয়নি সবাই৷ বিক্ষিপ্ত কিছু আলোচনা চলছে কামরাময়৷

পূর্ণ ঘুমের প্রস্তুতি নিলো সবাই৷ লাইট বন্ধ করে ডিম লাইট জ্বালানো হলো কেবল৷ হঠাৎ বাহিরে শুরু হলো বৃষ্টিপাত৷ অঝোর ধারায় বৃষ্টি৷ বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ বৃষ্টি৷ ভারী বর্ষণ ছিলো সেদিনের সেই বৃষ্টিতে৷ চলছে তো চলছেই আর থামার যেনো কোনো নাম-গন্ধও নেই৷ রাত ১২টার পর যেহেতু ১২ তারিখ আরম্ভ হয়ে গেছে, তাই অনেকে মজা করে বলতে লাগলো ম্যাজিক ডে-এর ম্যাজিক শুরু হয়ে গেছে৷

ম্যাজিক ডে-কে কেন্দ্র করে বাহিরে জায়গায় জায়গায় চলছিলো আতশবাজি৷ পুরান ঢাকা বলে কথা৷ সে কি উদ্ভট শব্দ! সহ্যের বাহিরে ছিলো সে সব আওয়াজ৷ সকালে পরীক্ষা৷ ঘুমুতে হবে এখন৷ এমন সময়ে এসব আওয়াজ কার ভালো লাগে? হঠাৎ অমন বৃষ্টিপাত শুরু হওয়াতে একটা উপকার হলো৷ বৃষ্টির কল্যাণে সব আতশবাজি বন্ধ হয়ে গেলো৷ সেই সাথে আমরাও রেহাই পেলাম উদ্ভট সেই শব্দদূষণ থেকে৷

সারা রাত সেদিন বৃষ্টি হয়েছিল৷ শেষ রাতে জাগ্রত হলাম৷ সকলের মুখে গুঞ্জন৷ এই তীব্র শীতে এমন কঠিন বৃষ্টি! কিভাবে কী? হিসেব মিলছে না৷ ফজর নামাজ পড়তে আমরা জড়ো হলাম মসজিদে৷ তখনো মুহতামিম সাহেব হুজুর মাওলানা জাফর আহমাদ সাহেব আসেননি৷ সকলে হজুরের পথে চেয়ে রইলো৷ হঠাৎ হুজুর আসলেন৷ চেহারায় কিছুটা বিষণ্নতার ছাপ দেখা গেলো৷ সবাই অবাক, কী হয়েছে হুজুরের?

নামাজান্তে হুজুর উঠে দাঁড়ালেন৷ ভারাক্রান্ত হৃদয়৷ কাঁদো কাঁদো স্বর বের হতে লাগলো হুজুরের কণ্ঠ চিরে৷ সবাই একে অপরের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করছে৷ কী হলো? হুজুর এতোটা ভারাক্রান্ত কেনো? কী ব্যাপার কে জানে? সবাই হতচকিত হয়ে অপলক নেত্রে তাকিয়ে রইলো হুজুরের দিকে৷ হুজুর কুরআনের আয়াত ও হাদীসের বাণীর সমন্বয়ে কথা শুরু করলেন৷

মৃত্যুর ব্যাপারে কিছু আয়াত ও হাদীস পেশ করলেন৷ হয়তো হুজুর নিজেকেই নিজে শান্ত্বনা দিতে চাচ্ছিলেন৷ একদম ভেঙ্গে পড়েছেন হুজুর৷ আমরা দিগ্বিদিত শূন্য অবস্থায় তাকিয়ে রইলাম৷ থেমে থেমে চোখ মুছে নিচ্ছেন হুজুর৷ কোনো সমীকরণ মিলছে না৷ হঠাৎ কেনো এমন বয়ান করছেন হুজুর! কেনইবা এতোটা ভেঙ্গে পড়েছেন? কুল-কিনারা পেলাম না আমরা কোনো৷

মুহতামিম সাহেব করাচি হযরত মাওলানা হাকীম আখতার সাহেব রহ.-এর খলীফা৷ হুজুরের একান্ত প্রিয় মানুষ করাচি হযরত৷ কারাচি হযরত রহ. তখনো জীবীত৷ বৃদ্ধ বয়সে উপনীত৷ বলতে গেলে জীবনের প্রায় শেষ লগ্নে অবস্থান করছেন তখন৷ আমরা ভাবলাম করাচি হযরত চলে গেলেন কিনা! কিছুটা আতঙ্ক বিরাজ করতে লাগলো আমাদের মাঝে৷ কিছুই বুঝতে পারলাম না আমরা৷

হুজুর বয়ান করে যাচ্ছেন৷ ইনিয়ে বিনিয়ে অনেক কিছুই বলছেন৷ মূল কথায় অনুপ্রবেশ করার দুঃসাহস যেনো নেই হুজুরের৷ যেনো এমন সংবাদটি বলার মতো হিম্মতই পাচ্ছেন না তিনি৷ ভগ্ন হৃদয়ে কিভাবেই বা শুনাবেন এমন সংবাদ? মনোবল যেনো হারিয়ে বসেছেন সব! এক পর্যায়ে সংবাদটি বলেই বসলেন৷ আমরা আতঙ্কিত হয়ে গেলাম৷ সঙ্গে সঙ্গে মৃদু আওয়াজে পড়ে নিলাম ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রজিউন৷

ভাবনার জগতে হারিয়ে গেলাম আমরা৷ যেনো আকাশ থেকে পড়লাম৷ নিজ কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না কেউ৷ এ কী শুনছি? বাস্তবেই এটা শুনেছি না অন্য কিছু? এমন সংবাদের কল্পনাও ছিল না কারো৷

পুরো মসজিদে ছেয়ে গেলো শোকের ছায়া৷ শোকের সাগরে ভাসতে লাগলো পুরো মসজিদ৷ কান্নার রোল জারি হয়ে গেলো মসজিদ জুড়ে৷ স্থির থাকতে পারলাম না কেউ৷ হতবিহ্বল হয়ে পড়লাম সবাই৷ এ কী করে হয়! এমনটা হতে পারে না! না এ মেনে যায় না!

মুফতী আমিনী সাহেবের মতো এমন একজন বীর সিপাহসালারা চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে! এটা কিভাবে মেনে নিতে পারি? আমাদের এতিম করে শোকের সাগরে ভাসিয়ে কিভাবে পারি জমালেন তিনি পরপারে? মেনে নিতে কষ্ট হয়৷ তবুও খোদার ফায়সালা৷ মেনে নিতেই হয়৷

রাত ১২ টার কিছু পরেই তিনি চলে গেছেন এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে৷ এবার বুঝে আসলো এই তীব্র শীতের মাঝে সারা রাতের এই অঝোর ধারায় বৃষ্টি পাতের কারণ৷ ওগুলো বৃষ্টি ছিল না৷ ছিল শোকসন্তপ্ত আকাশের কান্নার পানি!

মসজিদে দোয়া হলো মুফতী আমিনী রহ.-এর জন্য৷ ইসালে সওয়াবও করা হলো তৎক্ষণাত৷ সম্মিলিত দোয়া-মুনাজাতে হুজুরের মাগফিরাত কামনায় কান্নার রোল শুরু হলো গেলো মসজিদে৷ রোনা জারীতে ভরে গেলো মসজিদ৷ শোকে মুহ্যমানদের কান্নার শব্দে যেনো ভারি হয়ে উঠলো আকাশ-বাতাস৷ হাউ-মাউ করে কেঁদে ওঠলো সবাই একযোগে৷ মুনাজাতে এমন হাউ-মাউ করে আর কবে কেঁদেছিলাম মনে পড়ে না৷

দোয়া-মুনাজাত সমাপনান্তেত কামরায় এলাম৷ পরীক্ষার সময় কাছাকাছি৷ খবর পেলাম হুজুরের জানাজা হবে জাতীয় ঈদগাহে৷ যে করেই হোক যেতে হবে৷ এমন মহান মানুষের জানাজা পড়ার সুযোগ বারবার আসে না৷ কিন্তু পরীক্ষা তো! কিভাবে যাবো? উপরন্তু জানাজা বাদ জোহর৷ পরীক্ষা শেষ হতে হতেই আমাদের জোহর হয়ে যাবে৷ কী করা যায় ভাবতে লাগলাম!

সাত-পাঁচ ভেবে চললাম৷ পরীক্ষা না দেয়ার কোনো সুযোগ নেই৷ পরীক্ষা দিতেই হবে৷ হুজুরের প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসারা জানাজাও ছাড়ার সুযোগ দিচ্ছিল না যেনো৷ মহামুশকিল৷ কী করবো ভেবে পাচ্ছি না! হঠাৎ ক্লাসের একজন বলে ওঠল, পরীক্ষা হাফ টাইম দিয়ে জানাজায় চলে যাবো৷ আমি বললাম তাহলে আমিও যাবো৷ ব্যস৷ সিদ্ধান্ত হয়ে গেলো৷ পরীক্ষাও দিবো জানাজাও মিস হবে না৷

পরীক্ষার হলে গেলাম৷ খাতা-খলম নিয়ে কী লিখছিলাম জানা নেই৷ হৃদয়টা চলে গেলো ঈদগাহ ময়দানে৷ কী করে জলদি পৌঁছা যায়? কী করে সামনের জায়গাটা পাওয়া যায়? এমন হাজারো চিন্তারা তখন কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিলো আমায়৷ বেদনারা পদাঘাত করতে লাগলো হৃদয়ে৷ এক অসহ্য বেদনা৷ এ যে সহিবার নয়৷ এ ব্যাথার উপশম নেই৷ একমাত্র উপশম এ মহান মানবের জানাজায় যেতে পারা৷ এমন মহানদের জানাজায় শরীক হতে পারাও নিজের সৌভাগ্য বৈ কিছু নয়৷ এমন সৌভাগ্য সবার হয় না৷

ভাবনানুযায়ীই করলাম কাজ৷ দুই ঘন্টার মধ্যেই শেষ করে ফেললাম পরীক্ষা৷ বেরিয়ে পড়লাম হল থেকে৷ রুমে পৌঁছে দেখি সেই সাথী আগেই হাজির৷ আদ্যপ্রান্ত প্ল্যান করে নিলাম৷ কিভাবে যাবো, কোনদিক দিয়ে থাকবো, কিভাবে ফিরবো সব৷ প্রতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেই সেদিন বেরিয়ে পড়লাম হৃদয়ের টানে, এ মহান মানবের ভালোবাসায়৷

মহানদের জন্য ক্ষেত্র বিশেষ একটু আধটু বিপদের সম্মুখীন হওয়া ব্যাপার নয় কোনো৷ এগুলোর পরওয়া করতে নেই সর্বদা৷ প্রতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের কী শাস্তি তাও জানা৷ তদুপুরি সব হিসেব চুকিয়েই যেতে হবে আজ৷ ভগ্ন হৃদয়ে এগিয়ে গেলাম৷ সুযোগ মতোই বেরিয়ে পড়লাম ঈদগাহের পথে৷ পুরান ঢাকার আঁকা বাঁকা গলি পেরিয়ে বাস যোগে বহু কষ্টে পৌঁছলাম বাইতুল মোকাররাম পর্যন্ত৷ পুরো রাস্তায় জ্যাম৷ ঈদগাহ পর্যন্তই এ জ্যাম৷ গাড়িতে আর আগানো সম্ভব নয়৷ বাকি পথটা পায়ে হেঁটেই পারি দিতে হবে৷

রাস্তায় অজস্র মানুষের ভিড়৷ এই ভিড় ঠেলে কিভাবে পৌঁছবো ঈদগাহ পর্যন্ত ভাবতেই পারছিলাম না আর৷ গা শিহরিয়ে ওঠছে৷ যে করেই হোক পৌঁছতেই হবে সেথায়৷ অদম্য স্পৃহায় নেমে পড়লাম বাস ছেড়ে৷ জোহর নামাজ আদায় করে নিলাম বাইতুল মোকাররমেই৷ নামাজান্তে বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়৷ পুরো রাস্তাজুড়ে সাদার সয়লাব৷ টুপি আর টুপি৷ যেনো অজস্র ভক্তের হাহাকার হৃদয়ের উপস্থিতিতে, সহস্র টুপির সম্মিলন ৷ ভগ্ন হৃদয়ের শান্ত্বনার তাগিদে ছুটে এসেছে সবাই সকল প্রান্ত থেকে৷ শহর ও শহরতলী থেকে শুরু করে একদম অজোপাড়া গায়ের থেকেও ছুটে এসেছে ভক্তবৃন্দরা৷

এত অল্প সময়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষগুলোও কিভাবে কিভাবে এসে গেলো, ভাবনার শক্তিরা নিশ্চল৷ কয়েক মুহূর্তের জন্য খেই হারিয়ে ফেলি এত এত মানুষের আনা-গোনা দেখে৷ ভিড় ঠেলে এগিয়ে চললাম সম্মুখপানে৷ কোনো মতে পৌঁছলাম ঈদগাহে৷ উপচে পড়া ভিড়৷ তিল ধারণের জায়গা নেই অবস্থা৷ অনেকটা কষ্টের সম্মুখীন হয়েও কোনো রকম গিয়ে হাজির হলাম সম্মুখভাগে৷ অনেকটা কাছাকাছি পৌঁছলাম৷ যেনো হৃদয়টা উষ্ণ হয়ে ওঠছিলো মরহুম আমিনীর মায়ায়৷ শেষ বিদায় জানাতে এসেছি তাকে৷ পৃথিবীর চিরাচরিত নিয়ম এটাই৷ ইচ্ছাশক্তিরা এখানেই পরাজিত৷ ইচ্ছার বিরুদ্ধেই জানাতে হয় শেষ বিদায়৷

হৃদয়টা ফেটে যাচ্ছিলো শোকে৷ আস্তে আস্তে সময় গড়িয়ে যাচ্ছে৷ হৃদপিণ্ডের হার্ডবিটও বেড়ে চলছে ধীরে ধীরে৷ ধুক ধুক করে আওয়াজ আসছে হৃদয় ভেদ করে৷ অজস্র লোকের সমাগমে শত-সহস্র শব্দকেও হার মানিয়ে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম হৃদপিণ্ডের হাকডাক৷ সময় যত ঘনীভূত হচ্ছে ধুক ধুক আওয়াজ ততই বাড়ছে হৃদয়ের গহীনে৷ এক একটি আওয়াজ যেনো এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে পাজরের হাড়গুলোকে৷ অস্তির চিত্তে অবনত মস্তকে খোদার দরবারে দু’খোটা অশ্রু ঝরিয়ে মাগফেরাত চাইতে লাগলাম এই প্রিয়তমের৷

লাখো ভক্তের হৃদয় ভেঙ্গে দিয়ে তিনি চলে গেলেন৷ চলেই গেলেন তিনি৷ তিনি আর আসবেন না ফিরে আমাদের মাঝে৷ আর মোলাকাত হবে না তার সাথে এ জগত মাঝে৷ তিনি সত্যি সত্যিই চলে গেলেন হায়! অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি আপোষহীণ বজ্রধ্বনি আর শুনবো না হায়! বাতিলের ভীত কেঁপে ওঠবে না আর একটি বজ্রহুঙ্কারে৷ অন্যায়রা আর পদদলিত হবে না একজন নির্ভীক সৈনিকের পদতলে৷

তিনি তো চলেই গেলেন আমাদের ছেড়ে৷ আমরাও তাকে পাষাণ হৃদয়ের ন্যায় শেষ বিদায় জানাতে চলে এলাম আজ, আহ! দেখতে দেখতে জানাজাও শেষ৷ তরিৎ গতিতে একটি লাশভ্যানে করে নিয়ে যাওয়া হলো হুজুরের লাশখানা৷ অশ্রু সিক্ত নয়নে শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম হুজুরের লাশ বহনকারী গাড়িটির দিকে; গাড়িটির পথপানে৷ অশ্রুসজল আঁখি নিয়ে পরখ করতে লাগলাম গাড়িটির গতি৷ আর মৃদুস্বরে বলে ওঠলাম, হে মুফতী আমিনী! আল বিদা…!

শিক্ষার্থী: নদওয়াতুল উলামা লক্ষ্ণৌ, ভারত

-এএ

ad

পাঠকের মতামত

Comments are closed.