151272

ইসলামে শ্রমের মর্যাদা ও শ্রমিকের অধিকার

জুবায়ের রশীদ
তরুণ আলেম ও লেখক

অর্থনীতির পরিভাষায়, যারা সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিল্প কারখানায় কর্মকর্তার অধীনে শ্রমিক-কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন, তারাই শ্রমিক-শ্রমজীবী মানুষ। আর যারা শ্রমিকদের কাজে নিয়োগ করেন, তাদের নিকট থেকে যথাযথভাবে কাজ আদায় করেন এবং শ্রমের বিনিময়ে মজুরি বা বেতন-ভাতা প্রদান করেন, তারাই মালিক

মানুষ ও রাষ্ট্রের উন্নতির চাবিকাঠি হলো শ্রম। যে জাতি যত বেশি উদ্দমী ও পরিশ্রমী, সে জাতি তত বেশি উন্নত ও সমৃদ্ধ। একজন দিনমজুরের শ্রম, কৃষকের শ্রম, শিক্ষকের শ্রম, অফিসারের শ্রম, ব্যবসায়ীর শ্রম সবই সমান মর্যাদার অধিকারী। শ্রমের মর্যাদা সমাজের অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করে। রাষ্ট্রকে উত্তরোত্তর এগিয়ে নিয়ে যায় উন্নতির শিখরে।

শ্রমের ব্যাপারে আল্লাহ পবিত্র কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন, অতঃপর যখন নামাজ শেষ হবে, তখন তোমরা জমিনের বুকে ছড়িয়ে পড় এবং রিজিক অন্বেষণ কর। (সূরা: জুমা, আয়াত-১০)

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ হলেন নবী ও রাসুলগণ। যুগে যুগে অসংখ্য নবী ও রাসুল প্রেরিত হয়েছেন। তারা সকলেই শ্রম দিয়েছেন। শ্রমিক ছিলেন। শ্রমিক শব্দটি কখনোই অবহেলা, অসম্মান ও ভালোবাসার অপাত্র নয়। তারা সুন্দরের নির্মাতা।

হযরত আবু হুরাইরা রা থেকে বর্ণিত তিনি নবীজি থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা যত নবী রাসুল পাঠিয়েছেন সকলে ছাগল চরিয়েছেন। সাহাবীগণ বললেন হে আল্লাহর রাসূল আপনিও কি চরিয়েছেন ? তখন রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন হ্যাঁ! আমি কয়েক কেরাতের বিনিময়ে মক্কাবাসীদের ছাগল চরিয়েছি। (শ্রম খেটেছি)। (বুখারী, খন্ড, ১ পৃষ্ঠা নং, ৩০১ হাদীস, ২২০৭)

অন্যত্র নবীজি বলেন, কারও জন্য নিজ হাতের উপার্জন অপেক্ষা উত্তম আহার্য বা খাদ্য আর নেই। আল্লাহর নবী দাঊদ আলাইহিস সালাম নিজ হাতের কামাই খেতেন (বুখারী, খন্ড, ১ পৃষ্ঠা নং, ২৭৮ হাদীস, ২০২৫)

হযরত মুসা আলাইহিস সালাম ৮/১০ বছর শ্রম খেটেছেন। হযরত উতবাহ ইবনে নুদ্দার রা: থেকে বর্ণিত বলেন: একদা আমরা রাসূল সা এর দরবারে উপস্থিত ছিলাম সে সময় তিনি সূরা ‘তা সীন মিম’ তেলাওয়াত করতে করতে মুসা আ: এর ঘটনা পর্যন্ত পৌঁছেছেন, তখন রাসুল সা বলেছেন যে, আল্লাহর নবী হযরত মুসা আ: ও নিজের লজ্জা স্থানের হেফাজত ও পেটের ক্ষুধা নিবারণের জন্য ৮/১০ বছর শ্রম খেটেছেন। (মেশকাত, পৃষ্ঠা নং, ২৫৮)

শ্রমিকের অধিকার আদায়ে রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। তার কালজয়ী বাণী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের আলোকবর্তিকা হয়ে আছে। ইসলাম ও ইসলামের নবী শ্রমিককে যে অধিকার দিয়েছেন আর কোন ব্যক্তি ও মতবাদ তা দেয়নি।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সা বলেছেন যে, শ্রমিকের গায়ের গাম শুকিয়ে যাওয়ার আগে তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও। (মেশকাত, পৃষ্ঠা নং,, ২৫৮)

কিয়ামতের দিন শ্রমিকের পক্ষে মহান আল্লাহ দাঁড়াবেন। হযরত আবু হুরাইরা রা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূল সা বলেছেন যে, মহান আল্লাহ ফরমান জারি করেছেন যে কিয়ামতের দিন আমি তিন ব্যাক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেব (তাদেরকে নাস্তানাবুদ করে দেব) ১. যে ব্যক্তি আমার নামে শপথ করে, প্রতিশ্রুতি দেয় অতঃপর ওয়াদা ভঙ্গ করে। ২. যে ব্যক্তি কোন স্বাধীন লোক কে বিক্রি করে মূল্য খেয়ে ফেলল । (তাকে কৃতদাস বাণিয়ে দিল) এবং ৩. যে ব্যক্তি শ্রমিক নিয়োগ করে কাজ আদায় করে নিল কিন্তু শ্রমের পারিশ্রমিক প্রদান করল না।(বুখারী, খন্ড, ১ পৃষ্ঠা নং, ৩০২ হাদীস ২২১৫)

ইসলামে শ্রমের মর্যাদা অত্যধিক। শ্রম দ্বারা অর্জিত খাদ্যকে ইসলাম সর্বোৎকৃষ্ট খাদ্য হিসেবে আখ্যা দিয়েছে এবং জীবিকা অন্বেষণকে উত্তম ইবাদত হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে এরশাদ করেছেন, তিনি তোমাদের জন্য ভূমি সুগম করে দিয়েছেন। কাজেই তোমরা এর দিক-দিগন্তে বিচরণ কর এবং তার দেয়া রিজিক থেকে আহার কর। (সূরা: মুলক, আয়াত-১৫)

কোদাল চালাতে চালাতে একজন সাহাবীর হাতে কালো দাগ পড়ে যায়। রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর হাত দেখে বললেন, “তোমার হাতের মধ্যে কি কিছু লিখে রেখেছ ? সাহাবী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সা. এগুলো কালো দাগ ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি আমার পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণের জন্য পাথুরে জমিতে কোদাল চালাতে গিয়ে হাতে এ কালো দাগগুলো পড়েছে। নবীজী সা. এ কথা শুনে ওই সাহাবীর হাতের মধ্যে আলতো করে গভীর মমতা ও মর্যাদার সাথে চুমু খেলেন। এভাবে অসংখ্য কর্ম ও ঘটনার মাধ্যমে হযরত মুহাম্মদ সা. পৃথিবীতে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন।

রাসূল সা. বলেছেন, “তোমাদের অধীন ব্যক্তিরা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তায়ালা যে ভাইকে তোমার অধীন করে দিয়েছেন তাকে তা-ই খেতে দাও, যা তুমি নিজে খাও, তাকে তা-ই পরিধান করতে দাও, যা তুমি নিজে পরিধান কর।” (বুখারী, খন্ড, ১ পৃষ্ঠা নং, ৩৪৬ হাদীস, ২৪৭৫)

১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরের ‘হে’ মার্কেটে অধিকার বঞ্চিত শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজসহ বিভিন্ন দাবিতে সংগঠিত হয়ে আন্দোলন শুরু করে। বিক্ষোভ সমাবেশে নিরীহ শ্রমিকদের ওপর গুলী চালায় পুলিশ। নিহত হন অনেক শ্রমিক। শ্রমজীবী মানুষের আপসহীন মনোভাব ও আত্মত্যাগের ফলে মালিক পক্ষ শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী, ৮ ঘণ্টা কাজের স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।

কিন্তু আজ পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে, প্রতিটি শহরে শ্রমিকদের অধিকার নিগৃহীত হচ্ছে। তারা লাঞ্ছনা অপমান ও অপদস্ত হচ্ছে। তারা পাচ্ছে না তাদের প্রাপ্য মর্যাদা ও অধিকার। শ্রমের ন্যায্য মূল্য থেকে শ্রমিকদের বিতাড়িত করা হচ্ছে। মালিকপক্ষ শ্রমিকদের সবটুকু শুষে নিয়ে নামমাত্র পারিশ্রমিক পর্যন্ত দিচ্ছে না। যাদের ঘাম আর শ্রমের উপর নির্মিত হচ্ছে সম্পদের পাহাড় তারা তার থেকে কিছুই পায় না।

উপায় না পেয়ে তারা যখন রাজপথে নেমে আসে, আন্দোলন করে তখন রাষ্ট্র চালায় তাদের উপর অত্যাচারের স্টিমরোলার। ফলে দিনশেষে শ্রম ও শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা হচ্ছে না।

শ্রমিকদের কল্যাণ বিনির্মানে ১ মে’র সভা সমাবেশ, অসার বয়ান বক্তৃতা অহেতুক কার্যকলাপ বৈ কিছু নয়। দিনদিন শ্রমিকদের অবহেলা ও অধিকার বঞ্চনা বেড়েই চলছে। মালিকরা হয়ে উঠছে আরো বেশি বেপরোয়া। ওদের ডাকাতি কখনোই যেন বন্ধ হবার নয়।

শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায়, শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে এবং মালিকপক্ষের উর্ধ্বগামী রাক্ষসী নির্যাতন প্রতিরোধে ইসলামের শ্রমনীতি বাস্তবায়িত হোক। সুন্দর ও কল্যাণ সমাজ নির্মাণে ইসলামই একমাত্র পথপ্রদর্শক। ১৮৮৬ সালের ১ মে শুধু নয়, ইসলাম শ্রম ও শ্রমিকের এ মর্যাদা ও অধিকার ১৪০০ বছর আগেই নিশ্চিত করেছে।

ad

পাঠকের মতামত

৪২ responses to “‘জয় শ্রীরাম’ না বলায় এবার কলকাতায় হাফেজে কুরআনের উপর নৃশংস হামলা”

  1. Stepred says:

    Amoxicillin Drops Levitra Prix En Pharmacie Paris п»їcialis Amoxicillin And Dogs Difference Between Amoxicillin And Cephalexin

  2. Rebcync says:

    Cheap Generic Viagra Soft Pills Acheter Viagra Dollar Canadien cheapest cialis Original Flagyl Zithromax Cause Diarrhea Costo Cialis 5 Mg

  3. Kelvand says:

    Diflucan Amoxicillin And Children’S Dosage comprar viagra francia Achat Viagra Soft Medicine Without Prescription

  4. FranFUg says:

    Purchase Propecia Online Achat Orlistat cialis without a doctor’s prescription Cephalexin 500mg Doasage Levitra Generique Pharmacie Kamagra Tablets Uk

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *