155831

নতুন “আত্মঘাতী” বিতর্কে সৈয়দ ফয়জুল করিম

পলাশ রহমান: সৈয়দ ফয়জুল করিম। ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির। একজন আলোচিত আলেম, মুফতি এবং রাজনীতিক। বিভিন্ন সময়ে তার বিভিন্ন কথা নিয়ে দেশের ইসলামপন্থী অঙ্গনে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক মহলে ঝড় উঠতে দেখা যায়। তার সাম্প্রতিক এক বক্তৃতা নিয়ে দেশের ইসলামপন্থী মহলে চরম বিতর্ক শুরু হয়েছে।

১৭ রমজান বরিশালের এক ইফতার মাহফিলে বক্তৃতায় সৈয়দ ফয়জুল করিম বলেছেন, আত্মঘাতী হামলা ইসলামে জায়েয নেই। যারা আত্মঘাতী হামলা করে এবং তাদের যারা প্রশিক্ষণ দেয় উভয়ই জাহান্নমি।

প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, কে বলেছে ইসলাম আত্মঘাতী হামলা জায়েয রেখেছে? কোথায় পেয়েছেন? ইসলামের বই পুস্তক তো সবাই পড়তে পারে। সবার জন্য উন্মুক্ত। আমাকে দেখান কোথায় লেখা আছে এটা জায়েয? তিনি আরও বলেন, ইসলামের নামে যদি কেউ আত্মঘাতী হামলা করে তা হবে সন্ত্রাস, সন্ত্রাসবাদ। এর সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। আত্মঘাতী হামলা সম্পূর্ণ হারাম।

সৈয়দ ফয়জুল করিমের এ বক্তৃতার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে দেশের ইসলামপন্থী অঙ্গনে চরম বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে কওমি মহলে আলোচনা সমালোচনার ঝড় উঠেছে। কেউ কেউ বিভিন্ন হাদিস এবং ফতোয়াগ্রন্থের রেফারেন্স টেনে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন মুফতি সাহেব ভুল কথা বলেছেন। তাকে নোংড়া ভাষায় আক্রমণ করা হচ্ছে। তার কথাগুলো ইসলামপরিপন্থী প্রমাণ করার জন্য অনেকেই আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন বা সিরিয়ার উদাহরণ টানছেন। বলার চেষ্টা করছেন, শত্রুশিবিরে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য, যুদ্ধ জয়ের জন্য আত্মঘাতী হামলা শুধু জায়েযই হয় বরং উত্তমপন্থা।

সোশ্যাল মিডিয়ার বিতর্ক দেখে আমার মনে হয়েছে যারা ‘বিতর্ক’ করছেন তারা মূলত মুফতি সাহেবের বক্তৃতার আবেদন বুঝতে পরেনি। অথবা নিন্দা, বিদ্বেষ থেকে উদ্দেশ্যমূলক বিতর্ক করছেন। তাদের বিতর্কে সমালোচনা বা যুক্তির চেয়ে নিন্দার পরিমান অনেক বেশি।

আমরা জানি ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলামে সন্ত্রাস নেই, জিহাদ আছে। জিহাদ আর সন্ত্রাস এক কথা নয়। সম্পূর্ণ আলাদা দুটি বিষয়। জিহাদ হয় অন্যায় প্রতিরোধ করার জন্য। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য। আর সন্ত্রাস মানেই অন্যায়, জুলুম, পাপ, পঙ্কিলতা। যখন কেউ এই দুটি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলার চেষ্টা করে তখন তার অজ্ঞতা অথবা ধূর্ততা প্রকাশ পায়। এখানে স্মরণ রাখা দরকার- সৈয়দ ফয়জুল করিম আত্মঘাতী হামলার কথা বলেছেন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। তিনি যুদ্ধাবস্থার কথা বলেননি বা আফগান, সিরিয়ার কথাও বলেননি। তাছাড়া আত্মঘাতী হামলা করে সাধারণ মানুষ হত্যা করা, নিরীহ মানুষ হত্যা করা যে ইসলাম অনুমোদন করে না তা বুঝতে আলেম মুফতি হওয়ার প্রয়োজন হয় না, আমি মনে করি কমনসেন্সই যথেষ্ঠ।

ইসলাম যেহেতু পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান, সব বিষয়ে এর সুনির্দিষ্ট মাপকাঠি আছে। কুরআন, হাদিস এবং বিজ্ঞজনদের বিচার বিশ্লেষণ আছে। ইসলামের নামে হঠকারিতা করার অধিকার ‘ইসলাম’ কাউকে দেয় না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আর আফগান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, ইরাক, লিবিয়ার প্রেক্ষাপট এক নয়। ওইসব দেশের মানুষরা মূলত মুক্তিযুদ্ধ করছে। তাদের দেশকে বিদেশি শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে তারা যুদ্ধ করছে। সুতরাং যুদ্ধের কৌশল, দেশরক্ষার কৌশল আর রাষ্ট্রীয় ভাবে ইসলামের আদর্শ প্রতিষ্ঠার কৌশল সবক্ষেত্রে এক হওয়ার কথা নয়।

বাংলাদেশে কোনো যুদ্ধাবস্থা নেই। বিদেশি শত্রুর আক্রমণ নেই। বাংলাদেশে সকল ধর্মের সহাবস্থান আছে। রাজনীতিতে ভিন্নাদর্শ চর্চার সুযোগ আছে। নির্বাচনের মাধ্যমে শাসনতন্ত্রে পরিবর্তন ঘটানোর সুযোগ আছে। বাংলাদেশে অনেক ইসলামি দল রাজনীতি করছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। নির্বাচনের আগে তারা ইশতেহারের মাধ্যমে ইসলামি আদর্শের কথা জনগণের কাছে তুলে ধরছে। তারা যদি সঠিক ভাবে জনগণকে তাদের রাজনৈতিক আদর্শ বোঝাতে পারে তবে ভোটের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করে দেশের শাসনতন্ত্র পরিবর্তন করা অসম্ভব কিছু নয়।

বাংলাদেশের এ প্রেক্ষাপটে বোমাবাজি বা আত্মঘাতী হামলা যে কোনো বিবেচনায় অগ্রহণযোগ্য। তাছাড়া আত্মঘাতী হামলা বা চোরাগুপ্ত হামলা করে সাধারণ মানুষ হত্যা কোনো অবস্থাতেই ইসলাম বৈধতা দেয় না।

স্বাধীন বাংলাদেশে আত্মঘাতী হামলা করে সাধারণ মানুষ হত্যার মিশন চালু করে শায়েখ আবদুর রহমান, বাংলা ভাইরা। আদালতে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে, গির্জায়, রেস্তোরায় তাদের আত্মঘাতী হামলা, দেশব্যাপী বোমা হামলা ইসলামের নামে সন্ত্রাস বলেই বর্সগণ্য হয়েছে। দেশের বিজ্ঞ আলেমগণ এর পক্ষে মতামত দিয়েছেন। এসব হামলা থেকে কোনো অর্জন হয়নি।

তারা ইসলামের নামে তরুণ যুবকদের বিপথগামী করে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। যে মৃত্যু থেকে, হামলা থেকে নূন্যতম কোনো অর্জনের সম্ভবনা ছিল না। তারা এসব করে দেশের ইসলামপন্থী রাজনীতির পথ কঠিন করে তুলেছে। তারা হঠকারি করেছে। ইসলামের আদর্শ বা খেলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের ওপথ সঠিক নয়।

সৈয়দ ফয়জুল করিমের মধ্যে অনেক মানবিক ত্রুটি থাকতে পারে। তার কথা বলার ধরনে, শব্দচয়নে অসাবধনতার সমালোচনা আমিও করি। বিভিন্ন সময়ে আমি তার কড়া সমালোচনা লিখেছি। দেশের লাখো ধর্মপ্রাণ মানুষের মতো আমিও চাই চলনে বলনে তার মধ্যে আরও স্থীরতা ভাবগাম্ভির্যতার প্রকাশ ঘটুক। তিনি হয়ে উঠুন একজন সত্যিকারের ইসলামি স্কলার, একজন ডায়নামিক ইসলামপন্থী নেতা। দেশের ইসলামপন্থীদের ছোট ছোট মতভেদ উপেক্ষা করে তিনি হয়ে উঠুন একজন জনপ্রিয় নেতা। কিন্তু যারা সমালোচনার নামে তার নিন্দা করেন, গালমন্দ করেন, তাদের কাথা সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হয় বলে আমি মনে করি না। তারা নিন্দুক। তারা হিংশুক। তারা বিপথগামী।

মনে রাখা দরকার এ প্রজন্মের সৈয়দ ফয়জুল করিমদের মধ্যেই ঘুমিয়ে আছেন শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ., পীর ফজলুল করিম রহ., মুফতি আমিনী রহ.। তারা একদিন জেগে উঠবেন। অবশ্যই একদিন জ্বলে উঠবেন, যা সময়ের বেপার মাত্র।

লেখক : ইতালি প্রবাসী

-এএ

ad

পাঠকের মতামত

Comments are closed.