156519

ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, জেগে থাকি পাখিদের সুরে

সুফিয়ান ফারাবী

ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। শেষ প্রহরের ঘনকালো অন্ধকার। ঘড়ির কাটায় সাড়ে চারটে। ফরজে নামাজ আদায় করে মসজিদ থেকে বের হলাম। হঠাৎ বাম পকেটে ফোন বেজে উঠলো।

বাল্যবন্ধু নাঈম মাহমুদ ফোন করেছে। ওর বাসা সাভারে। কিন্তু হাটাজারিতে অধ্যায়নের কারণে সাভারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ছেলেটি। বাড়ির পাশে কতো সুন্দর সুন্দর দর্শনীয় স্থান, সেগুলো দেখার সময় তার নেই।

কয়েকদিন আগে রূঢ় কণ্ঠে কথাগুলো বলেছিলাম ওকে। সেসময় প্রতিক্রিয়া দেখে বুঝা যাচ্ছিল না- সাভারটাকে ঘুরে ঘুরে দেখার তীব্র ইচ্ছা ওকে যন্ত্রণা দিচ্ছে।

কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে নাঈম বললো, কিরে ফ্রী আছিস? আমি বললাম, হুম ফ্রী।
-তাহলে চল, জাহাঙ্গীরনগর যাই। শুনলাম ক্যাম্পাসের ভোরের দৃশ্য খানিকটা আলাদা। -ও তাই নাকি! -হুম। চল।
-কিন্তু বাহিরে তো গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি!

-আরে কিচ্ছু হবে না। আকাশ পরিষ্কার। কিছুক্ষণের মধ্যে এই গুড়ি গুড়িভাবও চলে যাবে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে স্ট্যান্ডে আয়।

এ বলে খট করে ফোনটা নামিয়ে রাখলো নাঈম। তবুও দুতিন বার হ্যালো, হ্যালো করলাম। কোন লাভ হলো না। ওপাশে কোন শব্দ নেই। কাল রাতে ঘুমোই নি। এখন ঘুমুতে না পারলে সারাদিন মাথা ব্যথা করবে।

এদিকে আকাশের অবস্থাও ভালো না। গুড়িগুড়ি বৃষ্টি চলছে। অল্প সময়ে বন্ধ হবে বলেও মনে হলো না। নাঈম দীর্ঘদিন পর চট্টগ্রাম থেকে এসেছে। ওর কথা ফেলবার ফুরসত নেই। দোটানায় পড়ে গেলাম। বিপদ, মহাবিপদ!

বন্ধুর বিষয়টি চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিলাম- জাবি যাচ্ছি। চড়লাম লক্কর ঝক্কর মার্কা বৃটিশ আমলের একটি গাড়িতে। ড্রাইভারের পাশের সীটে বসে দেখতে পাচ্ছি, গাড়ির কন্ট্রোল শক্তি নেই।

সময় মতো ব্রেক হচ্ছে না। তবুও মাঝবয়সী ছেলেটা স্ব জোরে ব্রেকে পা ফেলে গতি কমাবার চেষ্টা করছে। কখনো ব্রেক হচ্ছে, কখনো হচ্ছে না।

ক্যাম্পাসে ঢুকলাম। আকাশ তখনও অন্ধকার। পাখিরা গাছে গাছে বসে আছে। ডাকছে অতিথিদের। আমরা কান পেতে শুনছি। মনে হচ্ছিল, মর্নিং মিউজিক বাজছে। চড়ুই ডাকে দুষ্টুমির সুরে। কোকিলের ডাকে পরগাছা ভাব। শালিকের ডাকে হৃদয় পৌঁছে যায় প্রশান্তির আকাশে। সে কি মধুর ডাক!

হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছে গাছগুলোর উপর দিয়ে। মৃদু ঝাঁকুনি লাগছের ডালে। পাতায় জমে থাকা ফোঁটা ফোঁটা পানি টপটপ করে পড়ছে আমাদের শরীরে। বাতাস পেয়ে গাছের পাতায় পাতায় সংঘর্ষ হচ্ছে। জাম পাতার সরসর শব্দ শুনছে আমাদের কান।

কিছুদূর এগুতেই দেখা মিললো শাপলা শালুকের লেক। ফুটে আছে লাল লাল শাপলা। ফোয়ারা থেকে পানি পড়ছে শাপলার গায়। কিছুক্ষণ জমে থেকে আবার গড়িয়ে পড়ছে। আনমনাভাব। অনেকটা কচুপাতার মতো। হৃদয় কেড়ে নেবার মতো দৃশ্য।

হেঁটে হেঁটে দেখলাম পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। রাস্তার মাঝখানে ফুটে আছে বিচিত্র রঙের ফুল। ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় মানুষের চলাচল কম। দুচারজন প্রহরী ছাড়া কারো দেখা মিললো না। লাইব্রেরিটা বন্ধ। ভেবেছিলাম কিছুটা সময় লাইব্রেরিতে পার করবো। কয়েকটা বইয়ের পাতা উলটাবো। সেই আশা পূর্ণ হলো না।

তবে বইয়ের কাছ থেকে কিছু শিখতে না পারলেও শিখেছি প্রকৃতির কাছ থেকে। ফুল থেকে শিখেছি পবিত্রতা ও পবিত্র ভালোবাসা। পাখিরা শিখিয়েছে গান। ছন্দের গান। ঝরাপাতা শিখিয়েছে মৃত্যু। ফোঁটা ফোঁটা জল শিখিয়েছে নীরবতা ও বিনয়।

-এটি

ad

পাঠকের মতামত

Comments are closed.