157295

ছাত্রদের সঙ্গে আলী মিয়া নদভীর স্বপ্ন বিনিময়

বিংশ শতাব্দীতে মুসলিম বিশ্বের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.।ইতিহাসবিদ, আরবি ভাষা বিজ্ঞানীর পাশপাশি সীরাত গবেষক হিসেবে আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.-এর খ্যাতি উপমহাদেশের ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে আরব, ইউরোপ, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, মধ্য এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার শিক্ষিত মহলে ছড়িয়ে পড়েছিল। ২২ নভেম্বর ৬৫ খৃস্টাব্দে নদওয়াতুল উলামার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রদের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে মাওলানা নদভী রহ. যে নসিহত করেছিলেন সংক্ষেপে তা পেশ করা হচ্ছে। 

আমার স্নেহের ছাত্ররা! তােমাদের দেখে আমার আজ বড় আনন্দ হচ্ছে, যেমন খান্দানের ছােট ছােট বাচ্চাদের দেখে খান্দানের বৃদ্ধ মুরুব্বীর আনন্দ হয়। তােমরা খুব মেহনত ও পরিশ্রম করেছ এবং এ প্রতিযােগিতায় নিজেদেরকে পুরস্কারের যােগ্য প্রমাণিত করেছ।

তােমাদের উস্তাদগণ তােমাদেরকে পুরস্কারের যােগ্য মনে করেছেন এ জন্য আমি তােমাদের প্রতি আন্তরিক মােবারকবাদ জানাই।

তােমাদেরকে কিতাবপত্র এবং অন্যান্য যে পুরস্কার দেয়া হচ্ছে হয়ত বাজারে সেগুলোর অর্থমূল্য তেমন বেশী নয়, কিন্তু এদিক থেকে এগুলাে খুবই মূল্যবান যে, তােমাদের মুরুব্বীগণ এগুলাে তােমাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন এবং তোমাদের উস্তাদদের উপস্থিতিতে এই বলে তােমাদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে যে, আমাদের বাচ্চারা বিভিন্ন প্রতিযােগিতায় বিভিন্ন বিষয়ে উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জন করেছে।

আমিও যখন তােমাদের মত ছােট ছিলাম তখন আমাদের মুরুব্বীদের কাছ থেকে বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছিলাম, কিন্তু শৈশবের উদাসীনতায় সেগুলাে হারিয়ে গেছে। সে জন্য এখন আমার খুব আফসােস হয়। যদি বরকতের জিনিস হিসাবে সেগুলো এখন আমার কাছে থাকতাে তাহলে খুব ভালাে হতাে।

শৈশবের আনন্দের স্মৃতিগুলাে এবং উস্তাদদের দু’আর চিহ্নগুলাে এখন যদি আমার কাছে থাকতাে তাহলে খুব খুশি লাগতাে। কিন্তু শৈশবের অবহেলার কারণে সেগুলাে হারিয়ে গেছে। এখন আমি তােমাদেরকে নসিহত করছি, বরং অছিয়ত করছি যে, তােমরা এই পুরস্কারগুলাে খুব হেফাজত করে রাখবে, যেন ‘হারিয়ে না যায়।

যখন তােমরা আমার মত বুড়ো হবে তখন শৈশবের এই স্মৃতিগুলাে দেখে তােমাদের মনে বড় আনন্দ হবে এবং তােমাদের মনে পড়বে যে, আমাদের উস্তাদগণ আমাদেরকে মুহব্বত করে এই পুরস্কার দিয়েছিলেন।

বিভিন্ন বিষয়ের উপর আজ আমি তােমাদের বক্তৃতা শুনলাম। তােমাদের সবার বক্তৃতা রেকর্ড করা হয়েছে। আমি খুব খুশী হয়েছি। তােমাদের বয়স ও যােগ্যতা হিসাবে খুব ভালাে হয়েছে। এগুলাে থেকে তােমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের শুভ ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

আমি আশা করি, একদিন তােমরা বড় বড় লেখক-সাহিত্যিক হবে এবং উচ্চস্তরের বক্ততা হবে, আর এই যােগ্যতাগুলােকে তােমরা দীনের খেদমতে ব্যবহার করবে।

আমরা তাে এ দুনিয়ায় থাকবাে না, আমাদের পরে তােমরা দীনের এবং উম্মতের খেদমতের দায়িত্ব গ্রহণ করবে। ইনশাআল্লাহ। তবে একটি কথা বলতে ইচ্ছে করে। তােমাদের বক্তৃতাগুলাে যদি আরাে সহজ সরল ও সাবলীল হতাে তাহলে ভালো হতাে। সব সময় যেমন সহজ সরল ভাষা ব্যবহার করাে তেমন সহজ ভাষায় হলে ভালাে হতাে।

কেননা ভালাে বক্তৃতা সেটাই যার ভাষা সহজ থেকে সহজ এবং যার উচ্চারণভঙ্গি খুব। স্বাভাবিক, যেমন সব সময় আমরা কথা বলে থাকি। অবশ্যই তোমাদের বক্তৃতাগুলাে মােবারকবাদের যােগ্য এবং আমার মনে হচ্ছে যে, তােমাদের উস্তাদগণ যথেষ্ট পরিশ্রম করেছেন এবং তাদের পরিশ্রম অনেক দূর সফল। 

এখন আমি তােমাদেরকে কয়েকটি জরুরি কথা বলতে চাই। যদি তােমরা সেগুলাে মনে রাখাে এবং পালন করতে চেষ্টা করাে তাহলে তোমাদের লাভ হবে এবং তােমাদের ভবিষ্যত জীবন সুন্দর হবে। 

প্রথম কথা এ যে, শৈশবের জীবন বড় পবিত্র জীবন। তােমাদের কোন গুনাহ নেই, তােমরা মাসুম। তাই শিশু বয়সে মানুষ যা স্বপ্ন দেখে এবং যা কামনা করে আল্লাহ তা’আলা কোন না কোন সময় সেগুলাে পুরা করে দেন। সুতরাং এখন তােমরা ভবিষ্যত জীবন সম্পর্কে যা কিছু আকাঙ্খা করবে এবং আল্লাহর কাছে যা কিছু চাইবে খুব চিন্তা ভাবনা করে চাইবে।

এটা বড়দের বড় অভিজ্ঞতার কথা যে, শৈশবের স্বপ্ন ও কল্পনা ভবিষ্যতে বাস্তু হয়ে সামনে এসে যায়। শৈশবের কল্পনাকে আল্লাহ প্রায় বাস্তব করে দেন। সুতরাং এখন থেকে নিজেদের ভবিষ্যত সম্পর্কে তোমরা বড় বড় স্বপ্ন দেখাে এবং আল্লাহর কাছে বড় কিছু চাও।

এখন থেকে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করাে যে, তােমরা ইসলামের সত্যিকার খাদেম হবে, ইসলামের মুখলিছ দা’ঈ হবে। দা’ঈ মানে যে দাওয়াত দেয়। তাে দুনিয়ার মানুষকে তােমরা দীনের দাওয়াত দেবে, সত্যের পথে, সুন্দরের পথে ডাকবে। তােমরা ইসলামের নাম উজ্জ্বল করবে।

ইসলামের জন্য তোমরা জীবনের সবকিছু কোরবান করবে। আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দীনকে তােমরা বুলন্দ করবে। আমাদের পূর্বপুরুষগণ যেমন বড় আলিম ছিলেন, দাঈ ছিলেন, দীনের মুজাহিদ ছিলেন তােমরাও তাদের মত হবে।

বােকা ছেলেরা যেমন তুচ্ছ তুচ্ছ স্বপ্ন দেখে যে, ভবিষ্যতে আমি রেলগাড়ীর টিটি হবাে এবং বিনা পয়সায় রেলে ভ্রমণ করবাে, কিংবা থানার দারােগা হবাে, আর সবাই আমাকে সালাম করবে। এধরনের সাধারণ সাধারণ স্বপ্ন তারা দেখে।

যদিও এগুলাে খারাপ কিছু নয়, কিন্তু তােমাদের উচিত আরাে বড় স্বপ্ন দেখা, আরাে বড় হওয়ার প্রতিজ্ঞা করা। তবে এর অর্থ এই নয় যে, দারােগার পরিবর্তে এস পি হওয়ার স্বপ্ন দেখবে।

বরং তােমরা উত্তম থেকে উত্তম নিয়ত করাে এবং উত্তম থেকে উত্তম আকাঙ্খা করাে। তােমরা এই আকাঙ্খা করাে যে, আল্লাহ তা’আলা তাঁর পেয়ারা নবী থেকে যে কাজ নিয়েছেন দুহাবা কেরাম থেকে যে কাজ নিয়েছেন আমরা সারা জীবন সেই কাজ করবাে।

শৈশবের মাছুম অবস্থা আল্লাহর কাছে এতই প্রিয় যে, শিশুরা যা কিছু আকাঙ্খা করে, যা কিছু চিন্তা করে আল্লাহ তা পূর্ণ করে দেন। তোমরা এই প্রতিজ্ঞা করাে যে, আমরা আল্লাহর প্রিয় হবে এবং আল্লাহর বান্দাদের বেশির চেয়ে বেশি ফায়দা পৌঁছাবো।

দেখাে, মানুষের মাঝে আল্লাহ এই যোগ্যতা রেখেছেন যে, সে সবকিছু হতে পারে। ইচ্ছা করলে সে ফিরেশতাও হতে পারে, বরং ফিরেশতার চেয়ে বড় হতে পারে। কেননা আল্লাহ মানুষের মাঝে এমন কিছু গুণ রেখেছেন যা ফিরেশতাদের মাঝে নেই।

সুতরাং মানুষ যখন এতাে বড় হতে পারে তাহলে কেন তােমরা ছােট ছােট এবং তুচ্ছ তুচ্ছ আকাঙ্খা করবে? তােমরা সবসময় এই আকাঙ্খা করাে যে, আল্লাহ যেন তােমাদেরকে দীনের বিরাট বিরাট খেদমত করার তাওফীক দান করেন এবং এ যুগের জন্য এই সমাজের জন্য যে কাজের প্রয়ােজন আল্লাহ যেন তোমাদের থেকে সেই কাজ নেন। তােমাদের সম্পর্কে আমাদেরও এই আকাঙ্খা এবং স্বপ্ন আল্লাহ যেন কবুল করেন, আমীন।

সূত্র: সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভীর বয়ান সংকলন তারুণ্যের প্রতি হৃদয়ের তপ্ত আহ্বান ।

ad

পাঠকের মতামত

Comments are closed.