158860

ছাত্রজীবনে সময়ের গুরুত্ব

তানভীর সিরাজ

রাস্তার পাশে দোকানটি বরফের। দোকানদার কখনো হাসেন,আবার কখনো কাঁদেন। দোকানের সামনে আসা-যাওয়া করা জিজ্ঞাসু ছাত্রটি বলেন, চাচা, আপনাকে মাঝেমাঝে হাসতে, আর মাঝেমধ্যে কাঁদতে দেখি, কান্নাহাসির কারণ বলবেন কি?বরফের দিকে তাকানোই আমার কান্নাহাসির কারণ।

বরফ বিক্রি হলে হাসি পাই, না হলে কান্না পাই । তবে আসল বিষয়টি ভিন্ন। চাচা,আসল বিষয় আবার কি ? চাচা, এই যে দেখছ আমার বৃদ্ধজীবন বা বয়সকালের সময়,তা হল আসল বিষয়। অবহেলায় কত সময় নষ্ট করেছি বরফের মত জীবনের গতি প্রায় সায়াহ্নে।

জানি না কখন মাটির নিচে কবরে চলে যেতে হয়। তুমি এখনও ছাত্র।তোমার জীবন সবেমাত্র শুরু, সময়ের যত্ন নিলে, সময়কে মূল্যায়ন করলে এবং তার হেফাজতে আরো বেশি যত্নবান হলে অনেক বড় আলেম হতে পারবে। সময়কালের আলেমদের দিকে তাকিয়ে দেখো, যারা সময়ের প্রতি যত্নবান ছিলেন, তারা বাংলাদেশী হলেও বহিঃবিশ্ব তাদের নিয়ে ঈর্শা করে, বাংলার মানুষ তাদের নিয়ে গর্ব করে।

মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ সাহেব আওয়ার ইসলাম ২৪.কম-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এ কথা প্রসিদ্ধ যে,ভারত-পাকিস্কানের শিক্ষার্থীদের তুলনায় বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা অনেক মেধাবী।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের মেধাবী ছাত্ররা দেওবন্দ গেলেও ফাস্ট হয়, পাকিস্তান গেলেও ফাস্ট হয়। আমি (মুফতি সাহেব) নিজেও পাকিস্তানে মেশকাত,দাওরা এবং তাখাচ্ছুছের ক্লাসে ফাস্ট ছিলাম এবং পাকিস্তানের অল বেফাক বোর্ডে তিন নম্বর হয়েছি। এটা আমি অহংকার প্রকাশের জন্য বলিনি। এটা যা’লিকা ফাদলুল্লাহ, শুধুমাত্র উদহরণ স্বরূপ।

বাচা (তালিবুল ইলম), আপনি পড়ুন বা নাই পড়ুন, সময় আপনার জন্য অপেক্ষা করবে না, বিক্রি হলেও যেমন গলে যাবে, তেমনি বিক্রি না হলেও গলে যাবে, ক্রেতার জন্য অপেক্ষা যেমন করে না, তেমনি সময় আপনার জন্য অপেক্ষা না করেই আপন গতিতে বয়ে চলবে।

দৈনন্দিন মুতা’লাআ,সবক আর তাকরার করলে যেমন সময় চলে যাবে,না করলেও সময় আপনার জন্য বসে থাকবে না,চলে যাবে।

চল তাহলে তোমাকে পূর্বসূরিদের কথা শুনাই,আমরা যাদের উত্তরসূরী । শুনো , জ্বী। মুফতী মুহাম্মাদ শফী রাহ. বলেন, মানুষেরজীবন সম্পূর্ণই বরফের মত। প্রতি নিঃশ্বাসে একটি করে মুহূর্ত বিয়োগ হচ্ছে।

প্রতি মুহূর্তে আমাদের জীবন ছোট হচ্ছে। মানুষ বলে বয়স বাড়ছে। মাশাআল্লাহ সত্তর বছর হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তব কথা হল, যার যত বয়স বাড়ছে তার হায়াত তত কমছে। আমরা ছোট বেলায় একটি কবিতা পড়েছি-

غافل تجھے گھڑیاں يہ دیتا ہے منادی

گردوں نے گھڑی عمرکی اک اور گھٹا دی

হে উদাসীন! ঘড়ির কাটা তোমাকে ডেকে ডেকে বলছে। ঘড়ির প্রতিটি সেকেন্ড তোমার জীবন থেকে একেকটি মুহূর্তকে কমিয়ে দিচ্ছে।’

ঘড়িতে ঘন্টা বেজেছে। এর অর্থ, তোমার জীবন থেকে আরো একটি ঘণ্টা কমে । আলকাউসার, মুহাররম ১৪৩৬ ।

মুতা’আলা, সবক আর তাকরারের নতীযা বা ফলাফল সম্পর্কে হযরত আশরাফ আলী থানবী র. বলেন,“ যেসব তালিবুল ইলম নিয়মিত মুতা’লাআ, সবক আর তাকরার করবে, তারা অবশ্যই বড় আলেম হবে, যদি বড় আলেম না হয় তারা, তাহলে কিয়ামতের দিন আমার পান্জাবির আস্তিন ধরে রাখবে।”

সময়ের ব্যাপারে সাহাবা-তাবেয়ীগণ বেশ যত্নবান ছিলেন। যখনই তারা রাসূল সা.-এর কাছে কোনো হাদীস শুনতেন, তারা তা মুখস্ত করে নিতেন, আমল করতেন এবং অন্যের কাছে পৌঁছে দিতেন,যেন তারাও নেকির অংশে শরিক হন।

সময়ের ব্যাপারে সাহাবা –তাবেয়ীদের উক্তি

قال النبي صلي الله عليه وسلم :

“ما من يوم ينشق فرجه إلا وينادي يا ابن آدم أنا خلق جديد وعلي عملك شهيد ,فتزهد مني فإني لا أعود إلي يوم القيامة “

নবী কারীম সাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন , যখনই কোনদিনের প্রভাত উদিত হয়, তখনই সে মানুষকে সম্বোধন করে বলে, হে আদম সন্তান , আমি এক নতুন সৃষ্টি এবং কর্মের সাক্ষী। সুতরাং তুমি আমার থেকে পাথেয় সংগ্রহ কর। কেননা কিয়ামত দিবস পর্যন্ত আমি আর ফিরে আসব না।”

আল্লামা হুমায়দীর কয়েকটি কবিতা

لقاء الناس ليس يفيد شيئا

سوي الهذيان من قيل و قال

فاقلل من لقاء الناس الا

لاخذ العلم او اصلاح حال

”লোকের সাথে দেখা সাক্ষাতে , আজে-বাজেগল্প-গুজব ছাড়া আর কোন ফায়দা নেই। কাজেই মানুষের সাথে দেখা-সাক্ষাত কম করবে। কিন্তু ইলম হাসিল ও আত্মশুদ্ধির জন্য দেখা-সাক্ষাত করবে।”

(সূত্র: বুস্তানুল মুহাদ্দিসীন ,পৃ: ১৭৪,প্রকাশনা;ইসলামিক ফাউন্ডেশন )

প্রসিদ্ধ সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদরা.বলেন ,

ما ندمت علي شيئ ندمي علي يوم غربت شمسه,

نقص فيه أجلي ولم يزد فيه عملي

আমার সবচে’ আফসোস ও পরিতাপ হয় –এমন দিনের জন্য, যেদিনের সূর্য ডুবেগেল,আমার দুনিয়ার হায়াত কমে গেল, অথচ সেদিনে আমার নেকআমল বৃদ্ধি পেল না।

উমরে সানী হযরত উমর ইবনে আবদুল আজীজ র.বলেন , إن الليل والنهار يعملان فيكفاعمل فبهما

রাত ও দিন তোমার মাঝে কাজ করে চলছে , (তোমার চলা-ফেরা ও আচার-আচরণে কোন না কোন কাজ করে চলছে ) তাই তুমি ও তাদের মাঝে কাজ করচ

লবে ,(কোননা কোন ভালো কাজ, নেক আমল করে দিন-রাতকে অতিবাহিত করবে।) প্রখ্যাত তাবেয়ী হাসান বাসরীর.বলেন,

يا ابن آدم ! إنما أنت أيام ,فاذا ذهب يوم ذهب بعضك

হে আদম সন্তান ! তুমি তো কত কদিনের সমষ্টি মাত্র। সুতরাং যখন একটি দিন অতিবাহিত হয়েগেল তখন তোমার জীবনের একাংশ হারিয়ে গেল। তিনি আরো বলেন ,

أدركت أقواما مانوا عبي أوقاتهم أشد منكم حرصا علي دراهمكم ودنانيركم –

আমি এমন অনেক ব্যক্তির সাহচর্য পেয়েছি ,সময় সংরক্ষণে যাদের আগ্রহ ,তোমাদের ধন–সম্পদ সংরক্ষরণের আগ্রহের চেয়ে বেশি ছিল। (সময়ের মূল্য বুঝতেন যাঁরা ,শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ. :পৃ . ৩৬-৩৭)

কুরুনে সালাসার পরবর্তী যুগের মনিষিরাওমনিষি হয়েছেন ছাত্রজীবনে সময়কে যথাযতব্যাবহার করে, সময়ের প্রতি যত্নবান হয়ে।

তালেবানে ইলমে নবুওয়তের প্রতি কিছু প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক দ.ব. বয়ানে উল্লেখকরেছেন ।

আমাদের পূর্বসূরিদের মাঝে এই মুহাসাবার বড়ই গুরুত্ব ছিল।তাদের মধ্যে অনেকেই মুহাসাবার ক্ষেত্রে লেখনির দ্বারা সহযোগিতা নিয়েছেন। শাইখ (রহ.)‘রিসালাতুল মুসতারসিদীন’এর টীকায় শাইখ ইবনে আরাবী (রহ.) এর কথা উল্লেখ করেছেন-

‘‘আমাদের পূর্বসূরিরা তাদের কথা ও কাজের মুহাসাবা করতেন এবং সেগুলো খাতায় লিখতেন। ইশার পর নিজেদের মুহাসাবা নিতেন এবং খাতা উপস্থিত করতেন।

সারাদিনের কথা ও কাজের প্রতি নজর বুলাতেন এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতেন। যদি ইস্তেগফার করার মতো কোনো কাজ হত তাহলে ইস্তেগফার করতেন, যদি তওবা করার মতো কোনো কাজ হত তাহলে তওবা করতেন; যদি শোকর আদায় করার মতো কোনো কাজ হত তাহলে

শোকর করতেন।এরপর ঘুমোতেন।’’ ( রিসালাতুলমুসতারশিদীন(টীকা) ৮১-ফয়যুল কাদীর ৫/৬৭, আলকাউসার,মুহাররম ১৪৩৬ )

তালিবুল ইলমকে ইলম অন্বেষনে কিপরিমাণ সময় দিতে হবে ? তার উত্তরেকওমি অঙ্গনের প্রসিদ্ধ কবিতাটি প্রদানকরলাম। ছাহেবে হিদায়ার শাগরিদ আল্লামা যারনুজী রাহ. ‘তালিমুল মুতাআল্লিম’কিতাবে লিখেছেন-

العلم لا يعطيك بعضه حتى تعطيه كلك

“ তুমি যতক্ষণ না ইলমের জন্য তোমার সর্বস্ব দেবে, ইলম ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাকে কিছুই দেবে না। ”

মুফতী মুহাম্মাদ শফী রাহ. বলেন, “তো ভাই! আল্লাহ তাআলা এই দ্বীন এবং এই ইলমের মধ্যে এই যোগ্যতা রেখেছেন, যারা নিজেদেরকে ইলম চর্চায় মশগুল রাখবে,আল্লাহ তাদের জন্য রাস্তা খুলে দেবেন।”আল্লাহ তাআলা বলেন-

والذين جَاهَدُوا فينا لَنَهْدِيَنَّهم سُبُلَنا ‘যারা পরিশ্রম করে আমার পথে, আমি অবশ্যই তাদেরকে পথ প্রদর্শন করব।’

চাচা ,আপনি করেন বরফ বিক্রি, তাহলে কিভাবে এতজ্ঞান আপনি অর্জন করলেন ?কৌতুহলি হয়ে ছাত্রটি প্রশ্ন করল। আসলে আমি যে কেবল বরফ বিক্রি করি তা কিস্তু নয়, সময় পেলেই কাজের ফাঁকেফাঁকে আমি তা কাজে লাগাই নানা কিতাব বা ইসলামি বইপুস্তক মুতা’আলা করে।

যেমন করতেন বিশ্ববিখ্যাত কিংবদন্তী আলেমেদীন আল্লামা তাকী উসমানীর বড়ভাই মুহাম্মদ যাকী কাইফী র.। চল, এখন সেই কাহিনী শুনি তাঁর জবানিতে ।

“আমরা তাকে ভাইজান বলে ডাকতাম। তিনি দারুল-‘উলূম দেওবন্দে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত দরসে নেযামীর শিক্ষা লাভ করেছিলেন।অতঃপর এমন কিছু পরিপার্শ্ব দেখা দেয়,যদ্দরুণ তাঁর শিক্ষা সমাপন করা সম্ভব হয় নি। তিনি ওয়ালিদ সাহেব (রহ.) এর প্রতিষ্ঠিত কুতুবখানা ‘দারুল ইশাআত’ –এর দেখাশোনা করতেন।

তবে তার গভীর পাঠ্যাভ্যাস ছিলো। নিজে নিজে প্রচুর পড়াশোনা করেছেন। বিশেষত  ইতিহাস, সীরাত, তাসাওউফ এবং আকাবিরে‘উলামায়ে দেওওবন্দের জীবনীগ্রন্থ, তাঁদের ঘটনাবলী, তাঁদের মালফূযাত, মাওয়া‘ইজ ইত্যাদি বিষয়ক রচনাবলী।

এসব বিষয়ে তাঁর জানাশোনা এত বেশি ছিল যে, বড় বড় বিজ্ঞ‘উলামার পর্যন্ত অতটা দখল ছিল না।”আমার জীবনকথা,মুফতি তাকী উসমানী পৃ.৫৭।

বাচা, সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে।তোমার তাকরারের সময়ও কাছে । তাই কথা আর না বাড়িয়ে এখানেই ইতি টানছি আলী মিয়া নদভী আর আল্লামা ইকবালের কথা দিয়ে ।

যত তিক্তই হোক স্পষ্ট সত্য এই যে ,আমাদের দ্বীনী মাদরাসাগুলো যদি অস্তিত্ব রক্ষা করতে চায় এবং যিন্দেগির কাফেলায় মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করতে চায় এবং সময় ও সমাজের কাছে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তাহলে অবশ্যই তাকে নিজের উপকারিতা এবং যোগ্যতা ও উপযোগিতা প্রমাণ করতে হবে।

আল্লামা ইকবাল যেমন বলেছেন,‘জীবন হল নিরন্তর সংগ্রামের নাম, যোগ্যতা ও প্রতিযোগিতার মাধ্যেমে অধিকার প্রতিষ্ঠার নাম।’

চাচা, আপনার কান্নাহাসিতে সত্যি অনেক কিছু শিখতে পেরেছি,আলহামদুলিল্লাহ। বাচা, পড়,মন দিল্ লাগিয়ে পড়, বড় আলেম হবে, ইন্শাআল্লাহ।

বাচা, দোআ চাই। আস্সালামু আলাইকুমওরাহমাতুল্লাহ । চাচা, তুমি খুব ভালো ছেলে। কথা কান লাগিয়ে শোন। দোয়া চাইতে হয় না কি।

-এটি

ad

পাঠকের মতামত

Comments are closed.