160285

সন্তানকে সুশিক্ষা দিলেই মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে হয় না

তানভীর সিরাজ ◊

সন্তান আলোর মুখ দেখার আগেই পিতা-মাতাকে চিন্তা করতে হয় সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে। সন্তান আমার কী পড়বে? কোথায় পড়লে আমার সন্তান অনুগত থাকবে, অবাধ্য হবে না?

কেমন শিক্ষাব্যবস্থা আমার সন্তানের আগামীকে সুপথে পরিচালিত করতে সহায়ক হবে ? কোন শিক্ষাব্যবস্থা সন্তানকে মাদকতা, অশ্লীলতা আর সন্তুষ্টিবিহীন বিবাহআসরের মত অপছন্দীয় অবস্থার সম্মুখীন করবে?

দুঃসহ এক কষ্ট সহ্য করে যে সন্তানকে আলোর মুখ দেখান, সে কিনা আবার আপনার শত্রুতে পরিণত হয়! ভেবে দেখা সময়ের দাবি, মহাপ্রলয়ে কোন সন্তান শত্রু আর কে হবে আপনার মিত্র।

সেই প্রশ্ন কিন্তু আরও ১৪’শত বছর আগে সউত্তরে প্রকাশ করে দিয়েছেন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। বলেন তিনি, সন্তান তোমার শত্রু হবে আর বলবে, এরা হলেন আমার অভিভাবক; আগে তাদের ছেঁকা দিন। সন্তানের আগে কেন তার গুরুজনদের শাস্তি দেয়া হবে? একই বিষয়ের আয়াত কুরআন পেশ করছে- (وَقَالُوا رَبَّنَا إِنَّا أَطَعْنَا سَادَتَنَا وَكُبَرَاءَنَا فَأَضَلُّونَا السَّبِيلَا)  এবং বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক, প্রকৃতপক্ষে আমরা আমাদের নেতৃবর্গ ও আমাদের গুরুজনদের আনুগত্য করেছিলাম, তারাই আমাদেরকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করেছেন। (সূরা আহযাব-৬৭)

ফলাফল কী হবে? এ বিষয়ে কুরআন মুখ খুলেছে- (رَبَّنَا آتِهِمْ ضِعْفَيْنِ مِنَ الْعَذَابِ وَالْعَنْهُمْ لَعْنًا كَبِيرًا) হে আমাদের প্রতিপালক, তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি দিন এবং তাদের প্রতি এমন লানত করুন, যা হবে অতি বড় অভিশাপ। (সূরা আহযাব-৬৮)

কোন ছেলেমেয়ে মাতাপিতার সামনে থাকা জাহান্নামের প্রাচীর হয়ে সুপারিশ করে বলবে, হে আল্লাহ, ওয়াদা পূর্ণ করবেন বলেছিলেন, তাই বলছি, মা আমার, বাবাও আমার আর আমি জান্নাতের, কেন তারা জাহান্নামের? বাণীটিও কুরআনের।
( وَإِنَّ وَعْدَكَ الْحَقُّ وَأَنْتَ أَحْكَمُ الْحَاكِمِينَ) নিশ্চয় আপনার ওয়াদা সত্যই সত্য আর আপনি তো শ্রেষ্ঠ বিচারক। (সূরা হুদ:৪৫)

তাহলে ওয়াদা কী! যে হাফিজ সন্তান কুরআনকে ভালোবেসে বুকে ধারণ করে রাখবে, সেই অনুযায়ী আমল করবে, কুরআন বিক্রি করে রমজানে টাকা কামাই করবে না, তবেই তার জন্য আল্লাহ কতৃক ওয়াদা হলো, কিয়ামত দিবসে সে তার ইচ্ছামত জাহান্নামি ১০ জনকে সুপারিশ করে জান্নাতির কাতারবদ্ধ করাতে পারবে।

শিশুশিক্ষা নিয়ে মাওলানা আবু তাহের মিছবাহ ছোটদের ফাযায়েল-২-এ লিখেছেন। ধর্মহীন শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে আমাদের কোমলমতি শিশু- কিশোররা কী শিক্ষা লাভ করছে? তাদের হৃদয়ের নরম মাটিতে কিসের বীজ বপন করা হচ্ছে?

ঈমান ও বিশ্বাসের এবং আমল ও আখলাকের পুষ্প- বৃক্ষের, নাকি শিরক ও কুফুরির এবং অসত্য ও অসুন্দরের কণ্টক- বৃক্ষের?”
মুহাম্মদ -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-
বলেছেন, خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمه তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম, যে কোরআন শিক্ষা করে এবং শিক্ষা দেয়। তাই সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারলেই ‘সন্তানের সুশিক্ষাই বৃদ্ধাশ্রম প্রতিরোধক’ শ্লোগানটির বাস্তবায়ন আমরা করতে সমর্থ হবো, অন্যতাই পারবো না তাকে কাছে রাখতে, বিবাহের সুন্দরি আসর তাকে মমতাময়ী মাবাবা থেকে আলাদা করে ফেলবে, পরে তাঁদেরকে নিয়ে ভিন্ন চিন্তা করবে।

আর না পারতে বৃদ্ধ মাবাবাকে রেখে সে বাচ্চাকাচ্চাসহ নিয়ে অন্ত্র ঠাই জোগাবে; অথচ বৃদ্ধ, অসহায় ও অসুস্থ মাবাবা তাকে বিবাহ করিয়েছিলেন শেষ বয়সে এসে পড়ন্ত বিকেলে সকালবেলার সূর্য – কিরণের আশায় আর মায়ের নবদম্পতি সন্তান যেন বৃদ্ধবয়সে মাকে নিজ সন্তানের ন্যায় কোলেপিঠে করে বিদায়বেলার মেহমানকে আন্তরিক আপ্যায়ন দিয়ে নিজেকেই ধন্য করে।

অবশ্য এখানে একটি কথা না বললে নয় যে, অনেকে মাবাবাকে আলাদা করে দিয়ে নিজেদের আলাদা আবাসনে স্ত্রীকে স্বাধীনতা দিতে চায়, কারণ স্ত্রী শ্বশুর শাশুড়ির সেবায় অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, পরে ফুসলিয়ে স্বামীকে বৃদ্ধমাবাবা থেকে আলাদা করে ফেলে।
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী সুন্দর বলেছেন- যদি স্ত্রী স্বেচ্ছায় শ্বশুর শাশুড়ির খিদমত করে তাহলে উত্তম। কিন্তু করতে না চায়, তাহলে স্ত্রীকে খিদমতের জন্য বাধ্য করা যাবে না।

কারণ, এটি তার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত বিষয় নয়। এটি কেবলই তার সুন্দর আখলাক ও সামাজিক বন্ধনের স্থিতিশীলতার জন্য নৈতিক কাজ হিসেবে পরিগণিত।

তাই স্ত্রীদের উচিত সাধ্যানুপাতে শ্বশুর শাশুড়ির খিদমত করা। কারণ, আজকের গৃহবধূও এক সময় শ্বশুর শাশুড়ি হবেন, তখন তাদেরও খিদমতের প্রয়োজন হবে। সেই দিকে চিন্তা করে বৃদ্ধ শ্বশুর শাশুড়িকে নিজের মা ভেবে খিদমত করা উচিত। এতে করে আল্লাহ তা’আলা দুনিয়া ও আখিরাতে ইজ্জত দান করবেন।

কিন্তু এক্ষেত্রে শ্বশুর শাশুড়িদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, পুত্রবধূর দায়িত্ব ছিল না তাদের খিদমত করা। কিন্তু পুত্রবধূ দয়াপরবশ হয়ে কাজটি করছেন। তাই তাকে নিজের কন্যার মত স্নেহ ও মোহাব্বত করা উচিত।

অহেতুক তার দোষ তালাশে মত্ত হওয়া। তাকে স্বামীর কাছে, প্রতিবেশীর কাছে ছোট করার জন্য দোষচর্চা করা খুবই ঘৃণিত ও নিকৃষ্ট কাজ। যা থেকে বিরত থাকা প্রতিটি শ্বশুর শাশুড়ির কর্তব্য।

কুরআনী উদ্যোগ আজই গ্রহণ করুন আর নির্ধারণ করুন আদর্শ মৌলিক জ্ঞান ও সুশিক্ষা হিসেবে ইসলামী শিক্ষা দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ সাজাবার চেষ্টায় সচেষ্ট হোন তা হলে বৃদ্ধাশ্রম প্রতিরোধক পরিকল্পনা, পরিবার, সমাজ আর রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে পারব, পারব সুন্দর ভবিষ্যতের স্বাপ্নিক হতে।

-এট

ad

পাঠকের মতামত

Comments are closed.