162167

পার্কে ‘দৃষ্টিকটু’ অবস্থায় পাওয়া শিক্ষার্থীদের শাসন: এমপি একরাম কি ভুল করেছেন?

রকিব মুহাম্মদ: সম্প্রতি নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরী পার্কে বসে আড্ডা দেওয়া কলেজ পড়ুয়া যুগলদের শাসন করে সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন। মঙ্গলবার নোয়াখালী শহরের একটি পার্কে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইউনিফর্ম পরা দু’টি যুগলকে ‘দৃষ্টিকটু’ অবস্থায় থাকতে দেখে তাদের ভর্ৎসনা করে এবং সেখান থেকে চলে যেতে বলেন তিনি। এ ঘটনার ছবি নিজেই সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেন। এরপরই তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন সাংসদ একরামুল করিম।

সাংসদের ভাষ্য, “ঘটনাক্রমে ঐদিন পার্কটির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় স্কুল বা কলেজের পোশাক পরা অবস্থায় দু’টি যুগলকে দৃষ্টিকটু ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখলে সেখানে গিয়ে তাদের ভর্ৎসনা করি এবং সেখান থেকে চলে যেতে বলি। আর সাবধান করার জন্যই দ্বিতীয় যুগলটির ছবি ফেসবুকে পোস্ট করি।”

সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা চলছে। প্রশ্ন উঠেছে একজন সাংসদের অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে নৈতিক খবরদারি করার অধিকার নিয়ে। আবার এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেককে এমপি একরামের প্রশংসা করতেও দেখা গেছে। পার্কে বসা যুগলদের সতর্ক করা একজন জনপ্রতিনিধির দায়িত্বের মধ্যে পড়ে কিনা- এমন প্রশ্নও করেছেন অনেকে।

সাংসদের নৈতিক খবরদারি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কতটা যুক্তিযুক্ত এ ব্যাপারে মতামত জানতে শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের গ্র‌্যান্ড ইমাম ও জামিয়া ইকরা বাংলাদেশে শাইখুল হাদিস মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আওয়ার ইসলাম টোয়েন্টিফোর ডটকম।

মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ বলেন, “সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরী যে কাজটি করেছেন, অবশ্যই এটি একটি বৈধ এবং প্রশংসাযোগ্য। তিনি যুগলদের শাসন করে বা সতর্ক করে দায়িত্বজ্ঞানের পরিচয় দিয়েছেন। একজন এমপি জনগণের সেবক, সে হিসেবে সমাজের অনৈতিক বিষয়ের প্রতি খবরদারি করা তার অধিকারের আওতায় পড়ে বলে আমি মনে করি।”

দেশের অন্যান্য জেলার এমপি বা দায়িত্বশীলরাও এমন কাজ করতে পারে বলে মনে করেন দেশের প্রখ্যাত এই আলেমে দীন। তিনি বলেন, “দেশের অন্যান্য জেলার এমপি, ডিসি বা দায়িত্বশীল যে কোন ব্যক্তি সমাজের নৈতিক অবক্ষয় রোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন। আমরা সবধরণের ভালো কাজ করতে পারি। ইসলাম আমাদের সে সুযোগ এবং আদেশ দিয়েছে।” তবে কাউকে হেয় বা অপমান করা হয়- এমন কাজ নিন্দনীয় উল্লেখ করে তা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ।

এ ব্যাপারে কবি, গল্পকার, সাংবাদিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ আওয়ার ইসলামকে বলেন, “আমাদের সমাজে বহু বছর ধরে কিছু মূল্যবোধ প্রচলিত আছে, যা আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ধর্ম, নৈতিকতা ইত্যাদির আলোকে গড়ে উঠেছে। সামাজিক মূল্যবোধ এমন কোনও সস্তা ও চটুল বিষয় নয় যে, সকালে ভাবলাম আর বিকালে চর্চা করলাম, যদিও টাকা বা ক্ষমতার দম্ভে কিছু কিছু মানুষ সমাজে এমন অনেক কাজ আজকাল করে থাকছেন, যা আমাদের সমাজের প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এদের বিচ্ছিন্ন ও বাড়াবাড়ি ধরনের আচরণ বা কার্যক্রম সামাজিক নীতি বা মূল্যবোধের মর্যাদা পায় না। বরং সামাজিক মূল্যবোধ হলো সেটাই, যা  স্থায়ী এবং বহু মানুষের বহু দিনের অভ্যাস ও চর্চার মাধ্যমে ধর্ম, দর্শন, নৈতিকতা ও সংস্কৃতির মানদণ্ডে গৃহীত ও স্বীকৃত।”

চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপকের মতে, “সামাজিক মূল্যবোধের আলোকে আমাদের সমাজ চোর, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, বেহায়া প্রভৃতি ক্ষতিকর ব্যক্তির আচরণের নিন্দা করে এসেছে। সমাজে শৃঙ্খলা বিধানের জন্য প্রবীণ, বয়োজ্যেষ্ঠ, দায়িত্বশীলরা উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেছেন সামাজিক মূল্যবোধ জাগ্রত ও প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে। ফলে সমাজে বা এলাকায় কোনও সিনিয়র বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি প্রয়োজন মনে করলে মূল্যবোধের পরিপন্থী আচরণের জন্য শাসন ও সতর্ক করতেন এবং সবাই সেটা মেনে নিয়ে সমর্থনও করতেন।”

ড. মাহফুজ আরও বলেন, “কিন্তু বর্তমান আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ কয়েকটি কারণে প্রাচীন ও প্রতিষ্ঠিত এই মূল্যবোধটি লুপ্ত হওয়ার পথে। প্রথমত, সবাই ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য, স্বাধীনতা ও অধিকারের বিষয়ে এতো সোচ্চার যে, ক্ষেত্র বিশেষে পিতামাতা ও অভিভাবকদেরকেও মানতে চাচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, শাসনের বা সতর্ক করার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘন করার ফলে বিষয়টি অনেকের কাছে পছন্দনীয় নয়। তৃতীয়ত, মূল্যবোধের পরিবর্তনের ধারায় অন্ধ হয়ে অনেকে এসব পুরনো ও হিতকর মূল্যবোধ  মানতে নারাজ। চতুর্থত, অর্থ ও ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় সামাজিক মূল্যবোধ বিরোধী আচরণকে নিষেধ ও প্রতিহত করা বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে।”

“অতএব, এ বিষয়টি একজন ব্যক্তি বা একটি বিশেষ এলাকার ঘটনা হিসাবে বিচ্ছিন ভাবে দেখলে ভুল হবে। বিষয়টি সমগ্র সমাজের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক পরিবর্তন ও অবক্ষয়ের ফলস্বরূপ এসব বিতর্ক সামনে আসছে। ফলে সামাজিক পরিবর্তনের কতটুকু আমরা গ্রহণ করবো এবং মূল্যবোধ রক্ষার ক্ষেত্রে কতটুকু সীমারেখা মানবো, এ নিয়ে সবাইকে গভীর ভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। সমাজে অশ্লীল, অনৈতিক, অগ্রহণযোগ্য ও অসামাজিক কোনও কিছু যেমন মোটেও মেনে নেওয়া যায় না, তেমনি সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার নামে ব্যক্তির সম্ভ্রম, মর্যাদা ও ব্যক্তিগত অধিকার বিনষ্টকারী কোনও পদক্ষেপও নেওয়া যায় না।” যোগ করেন ড. মাহফুজ পারভেজ।

আরএম/

ad

পাঠকের মতামত

Comments are closed.