165871

আমার লেখালেখির গুরু

মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন


আমার লেখালেখির জীবনে যার দ্বারা শক্তভাবে প্রভাবিত হয়েছি তিনি হলেন অধ্যাপক আখতার ফারূক রহ.। তাঁর সম্পর্কে জানার পেছনে একটি ঘটনা আছে। তখন ফরিদাবাদ মাদরাসায় পড়ি। আমাদের উস্তাদ ছিলেন মাওলানা রুহুল আমিন খান উজানবী।

তাঁর একটি বৈশিষ্ট্য হলো তিনি অমেধাবী মানুষকে একদম দেখতে পারেন না। হুজুর একদিন ক্লাসে শরহে জামি পড়াচ্ছিলেন। আমি তখন নিচের জামাতে পড়ি। বাইরে থেকে শুনলাম আখতার ফারূক সাহেব সম্পর্কে কী জানি বলছেন।

শরহে জামিতে ইমরুল কায়েসের একটি কবিতার উদ্ধৃতি আছে: ‘ওয়ালাও আন্নামা আসআ লিআদনা মায়িশাতান; কাফানি ওয়ালাও আতলুব কালিলুম মিনাল মালি’। হুজুর এই কবিতার তরজমা করছিলেন এভাবে-

‘হতো যদি লক্ষ্য আমার তুচ্ছ বাঁচার অভিলাসে-
অল্পতেই ক্ষান্ত হতাম এত ত্যাগ আর কিসের আশে।’

আর বললেন, একদিন অধ্যাপক আখতার ফারূককে শোনালাম এই তরজমা। তিনি অবাক হলেন। বললেন, নজরুল বেঁচে থাকলেও এরচেয়ে ভালো তরজমা করতে পারতেন না।

হুজুরের মুখে আখতার ফারূকের কথা শুনে আমি বেশ আন্দোলিত হলাম। মনে মনে ভাবতে থাকি, আখতার ফারূক জিনিসটা কী খুঁজে বের করতে হবে। আমি ক্লাসের পর সাহস করে হুজুরের কাছে গেলাম। সাধারণ হুজুরের কাছে ছাত্ররা যাওয়ার সাহস করত না।

আমার সাহস করার কারণ হলো আমি কুমিল্লায় যে মাদরাসায় পড়েছি সেখানকার একজন উস্তাদ হুজুরের বন্ধু। তিনি আমাকে একটি চিঠি দিয়ে হুজুরের কাছে পাঠিয়েছিলেন।

বন্ধুর ছাত্র হিসেবে হুজুর আমাকে অন্যরকম স্নেহ করতেন। হুজুরের কাছে আখতার ফারূক সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তিনি আখতার ফারূকের বিস্তারিত পরিচয় দিলেন। তাঁকে ‘বাংলার আবুল কালাম আজাদ’ বলা হয় সেটাও বললেন।

হুজুরের মুখে আখতার ফারূকের পরিচয় জেনে তাঁর সম্পর্কে আরও কৌতূহলী হয়ে উঠলাম। একদিন ফরিদাবাদের হাউজে ওজু করছিলাম। আমাদের সিনিয়র মাওলানা আবদুর রাজ্জাক নদভী সাহেব কার সঙ্গে দাঁড়িয়ে যেন আখতার ফারূকের বাসায় যাওয়ার গল্প করছিলেন।

আমি তাদের গল্পের প্রতি বেশ মনোযোগী হলাম। তাঁকে বললাম, আমাকে কি আখতার ফারূক সাহেবের সঙ্গে একটু দেখা করিয়ে দেয়া যাবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ যাবে।

তখন আমাদের ক্লাসেরই আরেক ছাত্র বললেন, তাঁর ছেলে তো আমাদের সঙ্গে হিফজখানায় পড়েছে। আমি তোমাকে নিয়ে যাবো। আমি যেহেতু ক্লাসের একনম্বর ছাত্র ছিলাম তাই তারা আমাকে খাতির করে একদিন আখতার ফারূক সাহেবের গেন্ডারিয়ার বাসায় নিয়ে গেলেন।

তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। তাঁর সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটি আমাকে টেনেছে সেটা হলো প্রাণখোলা হাসি। বিখ্যাত কোনো মানুষকে এতোটা প্রাণখুলে হাসতে দেখিনি। সেদিন তিনি অনেক মজার মজার কথা বললেন।

এর মধ্যে হিট করার মতো কথা হলো, ইলম তোমাদের হুজুরদের কাছে। কিন্তু বাংলা বলার মতো একটু যোগ্যতা রাখেন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। দেশের মানুষ তাকেই চেনে। তোমাদের হুজুরদের তেমন চেনে না।

আরেকটি বিষয় বললেন, দেখ! তোমাদের হুজুরদের বিষয়টি হলো কোনো বিষয় তলিয়ে দেখে না। দেখবে একটা সময় ইমাম মাহদি আসবে আর হুজুররা তাকে কাফের বলবে। কেন জান? ইমাম খোমেনিকে তারা কাফের বলে। যেহেতু নামের সঙ্গে ইমাম আছে তাই তাকেও কাফের বলা শুরু করবে।

তিনি তখন ইরান থেকে সদ্য সফর করে এসেছেন। যেহেতু আমি তাঁর কাছ থেকে শিখব এজন্য নিয়ত করলাম এমন কিছু বলব না তিনি রাগ করতে পারেন। এজন্য তাঁর কোনো কথার সঙ্গে দ্বিমত করিনি।

পরে বললেন, এবার বল কিসের জন্য এসেছ? বললাম, বাংলাটা শেখার খুব আগ্রহ। আমি কি আপনার কাছে বাংলা শিখতে পারি? শুনে তিনি খুব খুশি হলেন। একজন মাদরাসা শিক্ষার্থী তাঁর কাছে বাংলা শিখতে এসেছে এতে তাঁর খুশির যেন সীমা নেই। বললেন, হ্যাঁ তুমি আসতে পারো। কখন আসব সেটাও বলে দিলেন।

আর জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি কিছু লিখতে পারো? আমি বললাম, হ্যাঁ, আমার নিজের মতো করে লিখতে পারি। বললেন, তাহলে ঠিক আছে একটি আর্টিকেল লিখে নিয়ে এসো। আমি বললাম, সামনে পরীক্ষা। এরপর রমজানে ফ্রি। রমজানে আসতে পারি? তিনি বললেন, হ্যাঁ রমজানে আসতে পারো। সকাল ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত সময় বলে দিলেন।

ওই রমজানে আমি মাদরাসায় রয়ে গেলাম একমাত্র আখতার ফারূক সাহেবের কাছ থেকে বাংলা শিখব বলে। রোজা রেখে প্রতিদিন প্রচণ্ড রোদে গেন্ডারিয়া যেতাম হেঁটে হেঁটে। কোনোদিন গিয়ে দেখতাম তিনি বাইরে চলে গেছেন।

আবার কোনোদিন তিনি দরজা খুলে প্রাণখোলা হাসি দিয়ে বলতেন, তুমি এসেছ ভালো হয়েছে, আমি এখন বাইরে চলে যাচ্ছি। শেষ রমজান পর্যন্ত সব মিলিয়ে ১২ থেকে ১৫টা লেখা লিখলাম। আর তাঁকে দেখালাম ৭/৮টা। তিনি প্রতিটি লেখা শব্দে শব্দে পড়তেন। ভাঙচুর করতেন। আমি যা লিখতে চাচ্ছি সেটা লেখায় প্রকাশ পাচ্ছে না এটা বুঝিয়ে দিতেন। কীভাবে শব্দ বিচার করে করে লিখতে হয় সেটা তাঁর কাছ থেকেই শেখা।

রমজানের শেষ দিকে বললেন, তুমি অনেক কষ্ট করেছ। আমি অল্পই পেরেছি তোমাকে পরিচর্যা করতে। আমি বাসা নিয়ে মোহাম্মদপুরে চলে যাচ্ছি। তুমি সেখানেও এসো। জানি না তোমার লেখা আর দেখার সুযোগ হবে কি না। তবে তোমার যে নিষ্ঠা তুমি লিখতে পারবে। এই আশির্বাদটা তিনি আমাকে দিয়েছেন।

পরবর্তী সময়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে তাঁর সঙ্গে প্রায়ই দেখা হতো। সাক্ষাৎ করে বলতাম আমি আপনার ছাত্র। সেই প্রাণখোলা হাসি দিয়ে বলতেন, হ্যাঁ মনে আছে, তুমি ভালো লেখ এবং এখন তোমরাই তো লেখবে। এখন অপেক্ষায় থাকি তোমরা কী লিখছ তা দেখতে।

[লেখা ও লেখকের কথা নিয়ে প্রকাশিত লেখকপত্রের সৌজন্যে। জুলাই ২০১৯ সংখ্যায় প্রকাশিত আত্মজৈবনিক সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন: জহির উদ্দিন বাবর]

ad

পাঠকের মতামত

Comments are closed.