166042

স্যার! জবাইয়ের সময় গরুটা আস্তে ফালায়েন…

মাহমুদুল হাসান


সবুজ গালিচা বিছানো বিস্তৃত মাঠ; শোলাকিয়া মাঠ। তার গা ঘেঁষে আরেকটা ছোট মাঠ। সেখানে প্রতি শুক্রবার বসে গরু ছাগলের হাট। খুবই জমজমাট এই হাট। দূর দূরান্ত থেকে এ হাটে গরু-ছাগল কেনার জন্য উৎসুক ক্রেতারা ভীড় করেন৷ ঈদে এ হাটের ক্রেতাদের ভিড়ে তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না।

শোলাকিয়া মাঠের নাম দেশের প্রায় সবার লোকমুখে শুনা যায়। অবশ্য এর একটা গ্রহণযোগ্য কারণও আছে। এক সময় এই মাঠে ঈদের জামাতে শোয়ালাখ মানুষের সমাগম হয়েছিল। এ থেকেই শোলাকিয়া মাঠ।

মাঠের পাশেই সবুজ গেটওয়ালা উঁচু দালানের বাড়িটা জাফর সাহেবের। জাফর সাহেব খুব নামিদামি ব্যক্তি। এলাকায় তার প্রশংসনীয় প্রভাবও রয়েছে৷ মানুষ তাকে এক নামেই চেনে। শোলাকিয়ার জাফর সাহেব। বিশেষ করে মাঠের পাশে সবুজ গেইটের উঁচু দালানটা তুলে সমাজের মানুষের দৃষ্টি কেড়েছেন।

কুরবানি ঈদ খুব দ্রুত ঘনিয়ে আসছে। জাফর সাহেবের গরু কেনার কাজটাও তাকে তাড়া দিচ্ছে বারবার। নামের খ্যাতি এবং সুপরিচিতির সাথে মিল রেখে এ বছর কুরবানিটা দেবেন বলে মনস্থ করেছেন। এলাকার সবচেয়ে বড় গরু কুরবানি দেবেন। তার হৃদয়ের অভিপ্রায়ের কথা লোকমুখে প্রচার করতে শুরু করেছেন৷

শোলাকিয়া পুকুর পারের চা আড্ডা থেকে শুরু করে মহল্লার অলিগলিতে এবং স্বজন-পরিজনদের মাঝেও আলাপে কমতি করেননি। তার স্ত্রীকে বলে রেখেছেন বাপের বাড়িতে বলে রাখতে। এ বছর কুরবানির গরুটা হবে এলাকার সবচেয়ে বড়। তারা যেন দেখার জন্য আসে।

জমেদ আলী পুকুর পারে আনমনা হয়ে বসে আছেন। মাটিতে কি যেন আঁকিবুঁকি করছেন। চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাপ। যা সয়ে নিতে তার কষ্ট হচ্ছে। একটু পরপর কী যেন বিড়বিড় করে বলেন আর হতাশার হাই তুলেন।

জমেদ আলী রিনা বানুর সাথে সংসার পেতেছেন আজ ১৪ বছর হয়। এত বছর পরও কোনো উত্তরসূরি আসেনি তাদের সংসারে৷ কিছুদিন আগে জানতে পারেন তার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা৷ এই সংবাদে জমেদ আলীর আনন্দের সীমা নেই, তবুও তিনি চিন্তিত। জমেদ আলী দিন মজুর মানুষ। কাজ করে দিন চলে। কোনোদিন কাজ না করতে পারলে স্বামী-স্ত্রীর অভুক্ত থেকে যেতে হয়।

জমেদ আলী ছোট থেকেই গরু পালনে আগ্রহী। গত দুই বছর ধরে একটা ষাঁড় লালন করছেন। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের শখের কেন্দ্রবিন্দু এই ষাঁড়টা। খুব যত্ম-আত্মি করেন। একদম সন্তানের মতো৷ সন্তার না থাকার বেদনা ভুলেন বোবা চারপায়া প্রাণী এই ষাঁড়টাকে যত্ম করে।

জমেদ আলীর স্ত্রীর দিন যত গড়াচ্ছে তিনি ততই চিন্তিত হচ্ছেন। কিছু দিন আগে ডাক্তারের সাক্ষাত নিয়েছেন। ডাক্তার বেশি করে দুআ করতে বলেছেন। অবস্থা ভালো না রিনা বানুর। তার গর্খপাত স্বভাবিক না হওয়ার কথা জেনে তিনি আরও বিচলিত হয়ে ওঠেন।

স্বামী-স্ত্রী পরামর্শ করেন৷ সিজারে বাচ্চা হলে এত টাকা কোত্থেকে জোগাড় করবেন। তাঁদের ভিটেমাটি ছাড়া সম্পদ বলতে তো কিছুই নেই। আছে একটা ষাঁড়। এটাকে তারা পশু না বলে নিজের সন্তান হিসেবে দেখেন। এটা বিক্রি করা কল্পানাও করতে পারেন না। চিন্তার রাজ্যে চলতে থাকে স্বামী-স্ত্রীর বসবাস৷ দিন যত পেরোচ্ছে তাদের শঙ্কার বাঁধ তত শক্ত হচ্ছে।

ধীরে ধীরে গর্ভপাতের কাছাকাছি সময় এসে যায় রিনা বানুর। সেই শুভক্ষণের পূর্বমুহূর্তে জমেদ আলী তার স্ত্রীকে নিয়ে যান ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার রিনা বানুর অবস্থা দেখে সিজারের ব্যবস্থা করতে বলেন। ডাক্তার মাত্র ১৫ দিন সময় হাতে ধরে দেন জমেদ আলীকে।

রাজ্যের চাপ মাথায় নিয়ে জমেদ আলী বাড়ি ফেরেন স্ত্রীকে নিয়ে। সন্ধ্যা রাতে হারিকেনের আলোতে রিনা বানুর চেহারায় এক রাজপুত্রের মা হওয়াত প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠে জমেদ আলীর দৃষ্টিতে। সারাদিনে গ্লানি ভুলে যান নিমিষেই। এবার স্বামী-স্ত্রী সিদ্ধান্তে উপনিত হলেন৷ স্বপ্নের সেই নবজাতকে সুস্থভাবে দুনিয়ার আলো দেখাতে তাদের আদুরে গরুটা বিক্রি করে দেবেন।

সামনে কুরবানি ঈদ। এই ঈদে কোনো এক বাজারে শখের গরু বিক্রি করে দেবেন জমেদ আলী। চার বৈঠাখালী নদীর পাশেই জমেদ আলীর বাড়ি। জমেদ আলীর একাকী সময় কাটে এই নদীর পারে বসে। দুপুরের খাবার খেয়ে আজও এসেছেন নদীর পারে৷ একাকী সময় কাটাতে। জমেদ আলী বসে আছেন। সময় যাচ্ছে ধীরে ধীরে। সাথে কমছে সূর্যের উষ্ণতাও। বিকেল গড়াতেই জমেদ আলীর চোখ যায় পশ্চিম আকাশে। একটু একটু করে দেখতে থাকে হেলে পড়া সূর্য! যতই হেলে পড়ছে সূর্য, ধীরে ধীরে আবিররঙা হয়ে উঠছে আকাশ, চারপাশ।

জমেদ আলীর নিরব হৃদয়ে অস্থিরতার আগমন। সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে হাটের উদ্দ্যেশে রওয়া হন গরু নিয়ে৷ শোলাকিয়া ঈদগাহের পাশের গরুর হাটে। রাতে গিয়ে হাটে জায়গা দখল করার তাগদা৷ কালই শেষ হাট। পরদিন ঈদ৷ গরু বিক্রি করাও তার জন্য অবশ্যক। আগামীকাল শখের গরু বিক্রি করে দিতে হবে! ভাবতেও পারছেন না জমেদ আলী। কিন্ত এ ছাড়া যে উপায়ও নেই। স্ত্রীর কান্নাভেজা চোখ। তার জন্য বিক্রি করতে হচ্ছে শখের গরু।

সন্ধ্যা রাতেই গরু নিয়ে ছুটলেন হাটের উদ্দ্যেশে। ফাঁকা রাস্তায় দ্রুত চলছে গরু বহনকারী ট্রাক। অল্প সময়েই হাটে পৌঁছেছেন জমেদ আলী। ট্রাক থেকে গরু নামিয়ে রেখেছেন৷ ভালো একটি জায়গা বেছে নিয়েছেন৷ একদম রাস্তার পাশে। কোন ক্রেতা এলে প্রথম চোখ পড়বে তার গরুর দিকে। জমেদ আলী এবার সকাল হওয়ার অপেক্ষায়। সূর্যোদয় হলেই আসতে শুরু করবে ক্রেতারা। বিক্রি করে দেবেন আদুরে গরু। জমজমাট হাট ।দুপুর গড়িয়ে বিকেল। এখনো গরু বিক্রি করতে পারেননি জমেদ আলী। অস্থির মনে দাঁড়িয়ে আছেন।

জাফর সাহেব গরু কিনতে এসেছেন সবেমাত্র। গরু দেখে যাচ্ছেন ক্রমাগত। খুঁজছেন সবচেয়ে বড় গরু। সন্ধ্যা ছুঁইছুঁই। আচমকা চোখ আটকে যায় জমেদ আলীর গরুর দিকে৷ জাফর সাহেব মনস্থ করলেন এ গরুটাই কিনবেন৷ অবশেষে ১ লক্ষ ৩৫ হাজার দিয়ে গরু কিনে নিলেন জাফর সাহেব৷ খুব খুশি। হাটের সবচেয়ে বড় গরুটা তার ভাগ্যে জুটেছে। খাজনা পরিশোধ করে বাড়ির পথ ধরলেন।

একটু পর পর প্রেক্টিস করছেন। লোকে দাম জিজ্ঞেস করলে কীভাবে উত্তর দিবেন। কোন স্টাইলে হাসি দিয়ে বলবেন। কেমন করে বললে গরুর দামের সাথে মিলবে। ভাবতে ভাবতে পৌঁছে যান বাসার কাছে। গরু নিয়ে বাসায় ঢুকলেন। পরিবারের লোক ছাড়া বাসায় কেউ নেই। গরু নিয়ে আসতে রাত হওয়ায় গরু দেখতে আসা লোকজন চলে গেছে। জাফর সাহেব নৈশভোজ শেষে বিছানায় গা এলিয়ে এপাশ ওপাশ করছেন অপেক্ষায়।

কখন সকাল হবে আর উৎসুক মানুষেরা তার গরু দেখতে আসবে। ঘড়ির কাটায় রাত ১১টা ১৩ মিনিট। আচমকা সবুজ গেইটে কট কট আওয়াজ। ভেতর থেকে বুঝা যাচ্ছ চার/পাঁচজনের সমাগম। জাফর সাহেব দ্রুত এগিয়ে গেলেন গেইটের কাছে। গেইট খুলে দেখলেন কয়েকজন সাংবাদিক দাঁড়িয়ে আছে ক্যামেরা নিয়ে৷ জাফর সাহেব বলে উঠলেন—‘এই যে এদিকে আমার কুরবানীর গরু। আমি সবচেয়ে বড় গরু কিনেছি। দেখুন দেখুন।’

: ‘আরে ভাই থামুন থামুন, আমরা আপনার গরু দেখতে আসিনি।’ বললেন একজন সাংবাদিক।

: ‘তো কেন এসেছেন? এত রাতে কী কাজ আপনাদের?’

: ‘আমরা এসেছি আপনার একটি সাক্ষাতকার নিতে। শোলাকিয়া মাঠের ব্যাপারে প্রতিবেদন পাঠাব৷ রাত বারোটার আগেই পাঠাতে হবে৷ একটু দ্রুত আসুন আমাদের সাথে, মাঠে দাঁড়িয়ে সাক্ষাতকারটা দেবেন।’

জাফর সাহেবের দ্রুত চললেন মাঠের দিকে। সাথে চার-পাঁচজন সাংবাদিক৷ পুরো মাঠে লাইটিং৷ পুলিশ বাহিনী নিরাপত্তার কাজ করছে। মাঠের কাছাকাছি এলে নিরব কান্নার আওয়াজ শুনতে পান একজন সাংবাদিক। সবাইকে দাঁড় করালেন। আস্তে আস্তে এগুতে লাগলেন। অনুভব করতে পারলেন মাঠের পাশে গরুর হাট থেকে আসছে কান্নার আওয়াজ৷ রহস্য উদ্ধারে এগিয়ে গেলেন সবাই।

একজন কৃষক গরুর ময়লা আবর্জনার বসে কাঁদছেন। মোবাইলের আলো জ্বলালেন জাফর সাহেব। কান্নারত লোকটা দেখে চেনা চেনা মনে হচ্ছে তার। কৃষক লোকটি চিনে ফেলল জাফর সাহেবকে৷ বলল—‘স্যার আপনি তো আজ সন্ধ্যায় আমার আদরের গরুটা কিনেছেন।’

: ‘হ্যাঁ কিনেছি তাতে কী হয়েছে? কোনো সমস্যা? আপনাকে টাকা কম দিয়েছি? নাকি জাল নোট দিয়েছি?’ একসাথে কথাগুলো বললেন জাফর সাহেব।

: ‘না স্যার টাকা কম দেননি।’

: ‘তো সমস্যা কী?’

: ‘স্যার গরুটা অনেক শখের ছিল। বউয়ের অসুখ না হইলে আমি গরুডা বেস্তাম না৷ শখের গরু তো এজন্য গরুডার মায়া ছাড়তে পারতেছি না তাই বসে বসে কাঁদছিলাম।’ অতঃপর করুনার দৃষ্টিতে তাকিয়ে জমেদ আলী বলে—‘স্যার, একটা অনুরোধ রাখবেন?’

: ‘হ্যাঁ বলো!’

: ‘স্যার, জবাইয়ের সময় গরুডা আস্তে ফালাইয়েন। গরুটা খুব আদরের ছিল স্যার, কোনদিন মারি নাই গরুডারে… বলেই কেঁদে দিল৷ একদম অবুঝের মতো কান্না।

জাফর সাহেব জমেদ আলীর কথা শুনে থ হয়ে গেলেন। অবাক দৃষ্ঠিতে তাকিয়ের রইলেন সত্যিকারে কুরবানী দেয়া মানুষটার দিকে। নিজেও একটু কাঁদলেন। মনে মনে বলতে লাগলেন আসল কুরবানি তো জমেদ আলীই দিয়েছে৷

লেখক : তরুণ সাংবাদিক ও গল্পকার

আরএম/

ad

পাঠকের মতামত

Comments are closed.