180883

আল্লামা হবগঞ্জী রহ. কে যেমন দেখেছি

মুসা আল হাফিজ ।।

দশটি বছর মাহে রমজান শায়খে হবগঞ্জী রহ. এর সোহবতে কাটানোর সৌভাগ্য হয়েছে। এমন জীবন্ত রমজান আর কোথায় মিলবে? মাগরিব পরে এশা অবধি নফল সালাতে একপারা তেলাওয়াত, প্রতিতারাবিহে দুই পারা, কোনো রমজানে তিন পারা, চার রাকাত পর পর দীর্ঘ তারওয়ীহা, বিতিরের পরে তাফসীরুল কুরআন, এক অন্যরকম আবহে ও মগ্নতায় চলে আসতো তাহাজ্জুদের প্রহর। তাহাজ্জুদে তেলাওয়াত হতো তিন পারা, কখনো চার পারা। এরপর সেহরি ও ফজরের নামাজের পরে দুই থেকে আড়াই ঘন্টা ঘুম। এটাই ছিলো মাহে রমজানের নিদ্রা। এরপর তেলাওয়াত আর তেলাওয়াত।

আসর পরে নির্ধারিত হাফিজরা শায়খের তেলাওয়াত শুনতেন। ইফতারের কিছুক্ষণ আগে তেলাওয়াত সমাপ্ত হতো। দ্রুতলয়ে কুরআন তেলাওয়াত তিনি করতেন না। এমন এক মায়াবি আবহ ছিলো তেলাওয়াতে, যা বিস্ময়কর। শেষ রাতের তেলাওয়াতে রহমত ও আশাবাদের আয়াতগুলো বার বার তেলাওয়াত করতেন। ভীতি ও খওফে খোদার আয়াতগুলো পূণরাবৃত্তি করতেন বারবার বারবার… কণ্ঠস্বর হতো কম্পমান, কান্না গমগম করতো, আওয়াজ রুদ্ধ হতো বার বার। আর মুনাজাতের আয়াতসমূহে এ অবস্থা হতো আরো প্রবল ও গভীর।

রমজানে কোনো ব্যস্ততাকেই জায়গা দিতেন না। যেনো তার আর কোনো দুনিয়া নেই। তিনি যেন এক জগত থেকে সফর করে অন্য এক জগতে চলে আসতেন, সেই জগতে কাটিয়ে দিতেন পুরো মাস। কথা তেমন বলতেই চাইতেন না। একান্ত প্রয়োজনে কেউ সাক্ষাৎ করতে চাইলে অনুমতি দিতেন, যথাসম্ভব অল্পকথায় বিদায় করে দিতে চাইতেন। পত্রপত্রিকাও তেমন পড়তেন না রমজানে। পত্রিকা প্রতিদিনের মতোই আসতো, দু’ চার মিনিট নজর বুলাতেন সংবাদসমূহে। সাংবাদিক এলেন জাতীয় ইস্যুতে কথা বলতে। বললেন,পুরো বছর জাতীয় বিষয় নিয়ে পড়ে থাকি। এই রমজানে আমাকে নিজের বিষয় নিয়ে পড়ে থাকতে দাও।

শেষ দশদিন এ’তেকাফ হতো। আলেম- ওলামাসহ অনেকেই আসতেন। দূর- দূরান্ত থেকে সালিকগণ আসতেন। সালিকদের মা’ মুলাত এবং এ’তেকাফরতদের এন্তেজামের বিষয়গুলো আমাকে বলতেন দেখার জন্য। কোনো ধরণের বেইন্তেজামি হলে খুবই ব্যথিত হতেন। কেউ অনর্থক কথা বলছে, গল্প করছে, এটা লক্ষ্য করলে মর্মাহত হতেন। বিশেষ করে কোনো আলেম থেকে এমনটা হয়ে গেলে নারাজির প্রকাশ ঘটতো বেশি।

এ সময়ে কেউ মুরিদ হলে সবক বুঝিয়ে দেয়ার জন্য আমার কাছে পাঠিয়ে দিতেন। এমনকি এ’তেকাফরত কারো সবক যদি পরিবর্তন হতো,নতুন সবক দেয়া হতো, সেটা কীভাবে আদায় করতে হবে, জানতে চাইলে বলতেন,মুসা আল হাফিজের কাছে যাও, সে দেখিয়ে দেবে।

আলহামদুলিল্লাহ, এভাবে সালিকদের অনেককেই আমার সাথে বিশেষভাবে যুক্ত করে দেন , যাদের কেউ কেউ পরে শায়খের খেলাফতও লাভ করেছেন। তরিকতে শায়খের ইজাজত লাভ ছিলো খুবই দুরূহ। ইজাজত প্রাপ্তদের সংখ্যাও অনেক কম। বছরের পর বছর নিরীক্ষা না করে তিনি কাউকেই ইজাজত দিতেন না। আবার ইজাজত লাভ করে কে কী করছে,সেটারও নজরদারি করতেন গভীরভাবে। ফলে এমনও হয়েছে যে,ইজাজত দেয়ার পরে তিনি খলিফাদের তালিকা থেকে কিছু নাম কেটেও ফেলেন। মুরিদ করার ব্যাপারেও তিনি বাছবিচারহীন ছিলেন না। যত বেশি সম্ভব মুরিদ করায় শায়খের অমত ছিলো। বলতেন,পীরাকি বিক্রি করে বেড়ানোর জিনিশ নয়।- লেখকের ফেসবুক থেকে নেওয়া

লেখক : কবি ও গবেষক

ad

পাঠকের মতামত

Comments are closed.