181327

ইজতেমা: দীনি মজলিসের উপহার

তানভীর সিরাজ ।।

বিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও সাধক হজরত মাওলানা ইলিয়াস আখতার কান্ধলভি (১৮৮৫-১৯৪৪ খ্রি.) দাওয়াতে তাবলিগ জামাতের পুনর্জাগরণ করেন। হজের পর বাংলাদেশের এ ইজতেমাকে মুসলিমদের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমাবেশ বলে মনে করা হয়।

প্রথম ইজতেমা ১৯৪১ সালে দিল্লির নিজামউদ্দীন মসজিদের ছোট এলাকা মেওয়াতের নুহ মাদরাসায় আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশে ১৯৪৬ সালে ঢাকার রমনা পার্কসংলগ্ন কাকরাইল মসজিদে তাবলিগ জামাতের বার্ষিক সম্মেলন বা ইজতেমা প্রথম অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রামে তৎকালীন হাজি ক্যাম্পে ইজতেমা হয়, ১৯৫৮ সালে বর্তমান নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। তখন এটা কেবল ইজতেমা হিসেবে পরিচিত ছিল।

প্রতিবছর ইজতেমায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আশাতীতভাবে বাড়তে থাকায় ১৯৬৬ সালে ইজতেমা টঙ্গীর পাগার গ্রামের খোলা মাঠে আয়োজন করা হয়। ওই বছর স্বাগতিক বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা অংশ নেওয়ায় ‘বিশ্ব ইজতেমা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। (দৈনিক প্রথম আলো)

প্রতিটি মেলামজলিসে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে যাওয়া হয়। এর মাঝে উত্তম অনুত্তমের বিষয়টি অবশ্যই বিবেচ্য। এই ইজতিমা এমন একটি মজলিস যেখানে গেলে মানুষের ঈমান আমল, ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক ও সাংসারিক জীবন ইত্যাদির ক্ষেত্রে শরিয়তকে জীবন চলার পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করাটা শিখা যায়। মেজায তৈরী হয় তাকে মেনে নেয়ার। ইজতিমা থেকে যা নিয়ে আমরা বাড়ি ফিরতে পারি তার কিছু এই-

ইকরাম: এই ইজতিমায় আসার দ্বারা অন্যকে ইকরাম বা সম্মান করার প্রতি অভ্যস্ত হয়ে উঠে। বিশেষ করে যাদের মাধ্যমে আমরা দীনের পথ পেয়েছি এবং শরিয়ত অনুযায়ী নিজেদের জীবন পরিচালনা করতে পারছি তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন মানবিক দায়িত্ব। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘আলিম হও, অথবা ইলম অন্বেষণকারী হও, অথবা ইলমের কথা শ্রবণকারী হও, কিংবা উলামা প্রেমিক হও, আর পঞ্চম প্রকার হও না তুমি ধ্বংস হবে।’

মাসিক আলকাউসারের এক জায়গায় এসেছে ‘আলিমগণ তো তাঁদের দায়িত্ব পালন করছেন, সাধারণ মুসলমানদেরকেও তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাদের দায়িত্ব কী? তাদের দায়িত্ব হচ্ছে, উলমায়ে কেরামের মেহনত ও কল্যাণকামিতার মূল্যায়ন করা এবং তাদের রাহনুমায়ী অনুসারে হককে অবলম্বন করা।’

আশেকে রাসুল: ইজতিমায় এসে আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেখানো পথ অনুযায়ী চলা সহজ হয়ে যায়। কারণ সেখানে বেশি থেকে বেশি সুন্নত ও তার ফযিলত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। আলোচনা হতে হতে একসময় তা অন্তরে গেঁথে যায়, অতঃপর আমল করা সহজ হয়ে যায়, যেহেতু তার লাভ সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন বলে সুন্নত অনুযায়ী আমল করাও সহজ হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে আমার সুন্নতকে ভালোবাসল সে আমাকেই ভালোবাসাল আর যে আমাকে ভালোবাসল সে আমার সাথেই জান্নাতে থাকবে।

যিকির ও মাগফিরাত: দীনি মজলিসে আসলে অনেক ফায়দার কয়েকটি হল মাসলামাসায়েল, দীনের জরুরি বিষয়াবলিসহ আরও অনেক কিছু শিখতে পারা যায়। সেইসাথে যিকিরের প্রতি আগ্রহও বাড়ে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ তোমরা বেশি বেশি আল্লাহর যিকির কর। আর সকাল-বিকালেও আল্লাহর যিকির কর।’

আর কুরআন-হাদিসের আলোচনা যেখানে হয় তাও যিকিরের অন্তর্ভূক্ত। তাই ইজতিমায় যারা আসেন তারা অন্তত পুরা তিনদিনই আল্লাহর যিকিরের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত ছিলেন। আর যারা আল্লাহর আলোচনায় একতাবদ্ধ হয় তাদের উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে সাকিনা নাযিল হয়, ফিরিশতাগণ তাদের বেষ্টন করে রাখে, আর তাঁর রহমত তাদেরকে ঢেকে রাখে। পরিশেষে আল্লাহ তাআলা দীনি মজলিসে উপস্থিত সবাইকে মাফ করে দেন। তাহলে যারা ইজতিমায় আসেন তারা সকলে গোনাহ মাফির অন্তর্ভূক্ত হন।

সম্প্রীতি, সামাজিকতা: ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার মোহে পড়ে আজ মুসলমানদের পরস্পর সম্পর্ক প্রতিনিয়ত ছিন্ন হতে চলছে। হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, এক মুমিন অপর মুমিনের জন্য প্রাচীরের মতো।’ হাদিস শরিফের এই অংশ থেকে বুঝা যায় এক মুমিন যদি অন্যায় ও অপরাধ বা কোনো গোনাহের কাজে লিপ্ত হয় তখন অপর মুমিন ভাইয়ের দায়িত্ব হলো তাকে প্রজ্ঞার সাথে বুঝানো আর না বুঝতে চাইলে গোপনে তার জন্য দোয়া করা, তবে শরিয়তে কখনো ঝগড়া করার অনুমতি নেই। হাদিস শরিফের আরেকাংশে বলা হয়েছে ‘যার একাংশ অপরাংশকে শক্তি জোগায়। সহিহ বোখারি: ৫/৯৯(২৪৪৬)।’ তাহলে আমাদের দাওয়াত আর দোয়ার মাধ্যমে সমাজে যখন সম্প্রীতি ফিরে আসবে তখন অবশ্যই বুঝে আসবে কীভাবে ‘যার একাংশ অপরাংশকে শক্তি জোগায়’।

অন্য হাদিসে বলা হয়েছে, পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, হৃদ্যতা ও কোমলতায় মুমিনের দৃষ্টান্ত হল একটি দেহের মতো। যখন তার এক অঙ্গ পীড়িত হয় তখন তার পূর্ণ দেহ বিনিদ্রা ও জরাক্রান্ত হয়ে তার দুঃখে সমান অংশিধার হয়। সহিহ বোখারি: ১০/৪৩৮ (৬০১১)।

ইবাদতে আগ্রহ: আমাদের মাঝে যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসুল এবং আহলে ইলম আলিমদের মনোবাঞ্চা আর তাঁদের দাওয়াতের উদ্দেশ্য বুঝে আসবে তখন অবশ্য ইবাদতে আগ্রহ জন্মাবে, অন্যথায় আমল করা হবে পূর্বের ন্যায়, তবে সেটি আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহ তাআলাকে ভালোবাসো তবে আমার রাসুলের আনুগত্য কর। তা হলে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং সমস্ত গোনাহ মাফ করে দিবেন।’ এখন তো আর কোনো নবী বা রাসুল আসবেন না। তাই শেষ নবীর সমস্ত উম্মতের উপর, বিশেষ করে আলিমদের উপর তাবলিগের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, যেহেতু তারা হলেন নবীর ওয়ারিশ।

সুন্দর পরিবার গঠন: এক সাহাবী রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নসিহত করার অনুরোধ জানালে তিনি বলেন, ‘রাগ করো না, রাগ করো না এবং রাগ করো না।’ এভাবে তিনবারই তিনি একই উত্তর দিলেন।’ একটু চিন্তা করলেই দেখা যায় এই রাগ আমাদের ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। একসময় সুন্দর পরিবার আর সুন্দর থাকে না। নেমে আসে অকল্পনীয় অনেক কিছু, যার চিন্তা কখনো করা হয় নি ইতিপূর্বে কখনো। রাগ না করাকে হাদিসে বাহাদুরি বলা হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ধরাশায়ী করার দ্বারা প্রকৃত বাহাদুর সাব্যস্ত হয় না; প্রকৃত বাহাদুর তো সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। সহিহ বুখারী: ১০/৫১৮ (৬১১৪)।

রাগের বিপরীত ধৈর্য্যশীলতা। পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় মতের বিপরীত অনেক কাজ করে বসে তখন করণীয় হল রাগ না করে ধৈর্য্য ধারণ করা। রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সবর বা ধৈর্য্য থেকে উত্তম ও সমৃদ্ধ কোনো কল্যাণ কাউকে দান করা হয় নি। সহিহ বুখারী: ৩/৩৩৫ (১৪৬৯)। তবে পারিবারিক বিষয় যদি কখনো জটিল আকার ধারণ করে তখন অবশ্যই বিজ্ঞ আলিমের সাথে পরামর্শ করতে হবে। ইন শা আল্লাহ সুন্দর সমাধান বের হয়ে আসবে।

আরএম/

ad