181264

উলামায়ে কেরাম: তাবলিগ জামাতের আন্তরিক অভিভাবক

তানভীর সিরাজ ।।

সর্বদা তাবলিগ জামাতের সাথীরা যাদের মুখাপেক্ষী, তাঁরা হলেন নবীর ওয়ারিশ, তার ইলমের একমাত্র ধারকবাহক হক্কানি উলামায়ে কেরাম। যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেখানো পথকে নিজের জিন্দেগীতে পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছেন।

তাবলিগ জামাতের মেহনত হল নবীওয়ালা কাজ আর নবীওয়ালা কাজ মানেই শরিয়তের বিধিনিষেধ নির্ভর পূর্ণ মানুষ গড়ার একটি প্রশিক্ষণ। যার সম্পর্কে একমাত্র উলামায়ে হজরত জ্ঞান রাখেন। যেহেতু তাঁরা এর পেছনে দীর্ঘ সময় ব্যয় করেছেন, শিখেছেন আর বুঝেছেন।

তাই বলি, কিছু কোর্স করে, কিছু প্রশিক্ষণ নিয়ে আর কিছু ডাক্তারি করে যেমন ডাক্তার হওয়া যায় না তেমনি কিছু শুনে, কিছু পড়ে আর কিছু বয়ান করেও আলিম হওয়া যায় না। দীনের কাজ সবসময় হক্কানি আলিমের মুখাপেক্ষী। আসুন, এবার তার স্বপক্ষে কিছু বর্ণনা দেখি!

যিনি তাবলিগ জামাতে আজকের রূপটি দাঁড় করিয়েছেন বা প্রবক্তা তিনি হলেন ফাযায়েলে আমল, সাদাকাত আর হজ্ব ইত্যাদির লেখক উপমহাদেশের প্রথম শায়খুল হাদিস আল্লামা যাকারিয়া রহ. এর চাচা হযরত ইলিয়াস কান্ধলবী রহ.।

তাবলিগের কাজ হক্কানি আলেম ছাড়া সম্ভব নই বলে নিঃসংকোচে তিনি বলে দিতেন, ‘শায়খের সাথে আলাপ না করে কিছু বলতে পারবো না।’

আমরা কিছু শুনে, কিছু কাজ করে আর কিছু বয়ান করে যদি আলেমদের অপ্রয়োজনীয় মনে করি, তাহলে সেটি নিতান্তই বোকামি হবে বলেছেন বিশেষজ্ঞ আলেম প্যানেল।

নিযামুদ্দিনের মাশওয়ারায় বহু বিষয়ে হযরতজী ইলিয়াস রহ. নিজেই সিদ্ধান্ত দেয়া থেকে বিরত থাকতেন যাকারিয়া রাহ.-এর পরামর্শের অপেক্ষায়।

হজরত শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রাহ. লিখেছেন- “তাবলীগের কাজে যদি চাচাজান কোনো বিষয়ের সম্মুখীন হতেন, নিঃসংকোচে বলে দিতেন, শায়খের সাথে আলাপ না করে কিছু বলতে পারব না। আমি প্রতিবার সফরে গিয়ে শুনতাম, আমার পরামর্শ ও মঞ্জুরির জন্য অনেকগুলো বিষয় আটকে আছে। একবার আমি নিযামুদ্দীন গেলাম। চাচাজান বললেন, আমাদের সাথীদের দাবি হল যখন জামাত গাশতে যায়, তখন তাদের সাথে একটা ছোট পতাকা থাকা উচিত। আমি বললাম, না। তিনি বললেন কেন? আমি বললাম, আপনার জামাত তো নামাযের জন্য ডাকতে যায় এবং লোকদেরকে মসজিদে জমা করে। আর নামাযের দিকে ডাকার জন্য পতাকার বিষয়টি হাদীসে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। তিনি বললেন, জাযাকুমুল্লাহ। ব্যস ভাই এই বিষয়টি বাদ।” (আপবীতি ১/৩৯২)

দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম ক্বারী তৈয়্যেব সাহেব রাহ.-এর উদ্দেশ্যে লিখিত এক পত্রে ইলিয়াস রহ. লিখেছেন- “আমার মতে, সকল পীর-মাশায়েখ, আলেম-উলামা ও রাজনীতি-বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের এমন একটি যৌথ জামাতের পরামর্শের অধীনে এ মুহূর্তে তাবলিগের সব কাজ করা দরকার, যারা একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও ব্যবস্থাপনার আলোকে প্রয়োজনমত পরামর্শক্রমে সকলের সদয় সম্মতি সাপেক্ষে ধারাবাহিকতা রক্ষা করে কাজগুলো পরিচালনা করবেন। মাঠ পর্যায়ের সকল কাজ এর অধীনেই হওয়া উচিত। অতএব, এ মুহূর্তে প্রথমত এমন একটি পরিষদ গঠন হয়ে যাওয়া দরকার।”- (মাকাতীবে হযরত মাওলানা ইলিয়াস রাহ.,পৃষ্ঠা: ১৪৪)

হজরতজী ইউসুফ সাহেব রহ. তাঁর এক বন্ধুকে এক পত্রে লিখেছেন- “দেখুন, ভালভাবে বুঝুন। আমরা সবসময় আকাবির উলামার মুখাপেক্ষী। তাদের ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নেই। তাদের আঁচল ধরে রাখা আমাদের জন্য সৌভাগ্যের কারণ। তাঁরা অনেকগুলো ভালো গুণ ও নববী নুরের ধারক-বাহক। তাঁদের মূল্য ও মর্যাদা দেয়া মানে নবুওতের মর্যাদা দেয়া। আমরা তাঁদের যে পরিমাণ খেদমত করব, তাদের খেদমতে উপস্থিত হওয়াকে ইবাদাত মনে করে তাঁদের উপদেশবাণীর উপর আমল করব এবং সার্বিক বিষয়ে তাদের সাথে পরামর্শ করব ততই উলূমে নববীর আলো থেকে উপকৃত হতে থাকব। -সাওয়ানেহে ইউসুফী, পৃষ্ঠা : ৪৫২)

এইসব বর্ণনা দ্বারা আমরা বুঝতে পারি যে, তাবলিগের প্রবক্তা স্বয়ং হযরত ইলিয়াস রহ. যেখানে হক্কানি আলেম ছাড়া তাবলিগ জামাতের বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দিতেন না, নিতেন না কোনো সিদ্ধান্ত সেখানে আমরা কীভাবে সাধারণ মানুষ হয়ে যেকোনো সিদ্ধান্তে রায় দিবো, অথবা আলিমগণকে ছেড়ে নিজেরাই আলেমের আসনে সমাসীন হবো? অথচ তাবলিগের প্রবক্তা হযরত ইলিয়াস রহ.স্বয়ং বেশ দক্ষ আলেম ছিলেন, এরপরেও তিনি আলেম ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত দিতেন না।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এক এবং নেক হওয়ার পাশাপাশি বুঝার এবং মানার তাওফিক দান করুন।

আরএম/

ad

পাঠকের মতামত

Comments are closed.