181226

বিশ্ব ইজতেমা: মুসলিম উম্মাহর ভ্রাতৃত্বের সম্মেলন

কাওসার আইয়ুব।।

বিশ্ব ইজতেমা মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম সম্মেলন। ঐক্য-সংহতি, ভ্রাতৃত্ব-সম্প্রীতির একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ ইজতেমা। ইলিয়াস রহ. এর হাত ধরে শুরু হওয়া দাওয়াতি কাজের সফলতার স্লোগান নিয়ে ৮০ উর্ধ্ব বছর ধরে ধারাবাহিক অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এ ইজতেমা।

১৯৪১ সালে দিল্লিা মেওয়াত থেকে শুরু হয় এর পদযাত্রা। পর্যাক্রমে ১৯৪৬ সালে ঢাকার রমনা পার্কে, ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রামের হাজী ক্যাম্পে, ১৯৫৮ সালে নারায়নগঞ্জের মাটিকে সুবাসিত করে। ইজতেমার মুসল্লিদের পদধুলি। ১৯৬৬ সালে টঙ্গীর  ‍তুরাগ তীরে দেশী-বিদেশী সর্বস্তরের মুসলমানদের নিয়ে সংগঠিত ইজতেমার মাধ্যমে স্থান পালা এখানে শেষ জয়। ৬৬ থেকেই মুসলমানদের এই মহাসম্মেলন ‘বিশ্ব ইজতেমা’ নামে বিশ্ব দরবারে সম্মাননার পদক লাভ করে।

উলামায়ে কেরাম ও দাওয়াতি ভাইদের অশ্রুসিক্ত দোয়া এবং ঘামঝরা মেহনতের মাধ্যমে দিন দিন প্রভু প্রেমিকদের এ কাফেলা ভারি হতে থাকে। বাড়তে থাকে দিন দিন দাওয়াতি মেহনত ও দাওয়াতি মানুষ। এক পর্যায়ে ১৬০ একরের বিস্তৃত প্রান্তর সংকীর্ণ হয়ে পড়ে মুসল্লিদের ভিড়ে। উপচে পড়ে প্রভু প্রেমিকদের ভিড়। মুসল্লিদের ঢলে পুরো টঙ্গী এলাকায় ছেয়ে যায় রবরব এক পরিবেশ।

এই বিশাল আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হয় কয়েক মাস আগ থেকেই। সুবিশাল এই কার্যক্রমকে বাস্তাবায়নের জন্য তাবলিগ জামাতের কেন্দ্রীয় কোন ফান্ড, নিজস্ব বাজেট না থাকা সত্ত্বেও সুচারোরূপে সম্পুর্ণ হয় তার সকল প্রস্তুতি।

দীনি ভাইদের দোয়া মেহনত ও আল্লাহর রহমতই এর মূল শক্তি। কোন প্রকার মাইকিং, লিফলেট, পোস্টার ছাপানো হয় না এ সম্মেলনের প্রচারণার জন্য। না কোন বক্তার নাম ঘোষণা করা হয় বয়ানের পূর্বে। তবে খোদা প্রেমিকদের এতে অংশগ্রহণের উচ্ছাসে সামান্য চির ধরাতে পারে না শীতের কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহ। সকল বাধা কাটিয়ে মুসল্লিরা হাজির হয় তুরাগ তীরের বরকতময় মাঠে।

পরস্পরের সহমর্মিতা, সহনশীলতা, মমত্ববোধ সহানুভূতির ও উদারতা প্রকাশের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠে তাদের মাঝে অকৃত্রিম ভ্রাতৃত্ববন্ধন। যাবতীয় অহংকার ও পতিপত্তি ভুলে গিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ শান্তিময় একটি পরিবেশের অবতারনার। সৃষ্টি হয় পুরো ময়দান ঘিরে। ফলে বিশাল শামিয়ানার নিচে মাটিতে আপন করে পাশাপাশি শুয়ে থাকে রাজনৈতিক, সাহিত্যিক, ধনী-গরীব, ছাত্র-শিক্ষক আর কৃষক-শ্রমিক। মাথা ডিঙ্গিয়ে পথিক চলে যাচ্ছে” ঘাড় ফিরিয়ে দেখছে না কে যায়। তাদের এই সম্পৃতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে পথিকের মাথা ডিঙ্গিয়ে যাওয়াকে চোখ বুঝে মেনে নেয় বড় মনের মানুষ।

বাংলাদেমর মতো ছোট গরীব রাষ্ট্রে ইজতেমাকে কেন্দ্র করে বুকভরা উচ্ছাস নিয়ে ছুটে আসে আবর-অনারব, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য থেকে শত সহস্র মানুষ। নানা বর্ণ, ভাষা মাজহাব ও মতাদর্শী হয়েও তারা একই পরিবারের পরিণত হয় তারা। ভিন্ন ভিন্ন মাজহাব ও মতাদর্শী হয়েও তারা একই ইমামের পিছনে বিনীত সিজদায় লুটিয়ে পড়ে শীতল হলে। ফলে বর্ণ ভাষার গৌরব, সাদা-কালোর ভেদাভেদ, আরব আজমের তফাৎ, প্রচ্য-প্রশ্চাত্যের মধ্যকার ব্যবধান পর্দা সরে গিয়ে মোহনীয় এক দৃশ্যের অবতারনা হয়। বোধহয় পৃথিবীর সকল মানচিত্র একই সরলরেখায় পরিচালিত। আখেরী মুনাজাতের দিন জন সমুদ্রে পরিনত হয় গোটা টঙ্গী ময়দান।

প্রতিবছরের মতো এবারও শুরু হয়েছে ১০,১১,১২ জানুয়ারিতে ভিশ্ব ইজতেমা। চির সফল হোক এই ইজতেমা। ইলিয়াসের হাত ধরে নবীজীর দাওয়াত চড়িয়ে পড়ে পুরো বিশ্বে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইফতা প্রথম বর্ষ, জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া যাত্রাবাড়ি, ঢাকা। 

আরএম/

ad