185028

আমাদের প্রার্থনার ফুলঝুরিতে সুবাসিত হোক একুশের শহীদরা

জুবায়ের রশীদ
তরুণ লেখক

ফেব্রুয়ারি এলেই ভাষার প্রতি মমতা কেমন বেড়ে যায়। অস্তিত্বের শেকড়ে বিন্দু বিন্দু জমে থাকা ভালোবাসাগুলো যেন নতুন করে প্রাণ পায়। চেতনার ডালপালা নড়তে থাকে। চারপাশে বইতে থাকে ভালোলাগার বাতাস। নির্জন কামরাঙা রোদের দুপুরে ছায়া ও মায়াঘেরা টুকুস টাকুস পাখির আওয়াজকে ভারি মিষ্টি লাগে। নিশ্চুপ বিকেলে নদীর তীরে হিজলের ছায়া সে কি চূড়ান্ত মাদকতা টেনে আনে প্রকৃতির ঘোরে।  আলোহীন ধূসর গোধূলিতে নীড়ে ফিরতে থাকা শেত বলাকাদের সারি সারি ডানার শব্দকে মনে হয় এ যেন হাজার বছরের চেনা এক সুর।

বৈঠা হাতে মাঝির মুখে ভাটিয়ালি টান নদীর মৃদু তরঙ্গে স্পন্দন আর ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে ইথারে ইথারে যেন পৌঁছে যাবে মহাকালের ঘাটে। সুদূর তীরের বন্দরে। শিশুর মুখের উচ্ছ্বল হাসি, মনের মাধুরি মিশানো পুষ্পরেণু সুবাসিত মায়ের ডাক, বাবার বা হাতের ছোটো আঙুলে ধরে নেচে গেয়ে শৈশবের সেই হেঁটে যাওয়া, রৌদ্রকরোজ্জ্বল সকালে দৌড়ে দৌড়ে হারিয়ে যাওয়া অফুরন্তসব আনন্দের ভেতর, বাংলার আবহকালীন এ সুন্দর চিত্রগুলো ফের জীবন্ত হয়ে ওঠে। আর এ সবকিছুর ভেতরই যেন মাথা উঁচিয়ে জেগে আছে একটি ভাষা।

সবুজ পাতার মতো স্নিগ্ধ ভোর, রোদ ঝলসানো দুপুর, পাখি ওড়া গোধূলি, অপরূপ সন্ধ্যা, জোছনাভেজা রাত এ সবের ভেতরই জীবন্ত হয়ে আছে একটি ভাষা। যার অপার কল্যাণে চিরচেনা মনে হয় সবকিছু। পাখির ডাক নদীর ঢেউ মাঝির টান শিশুর হাসি এবং মায়ের কথা সবই যেন প্রিয় সে ভাষার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে।

ফেব্রুয়ারি এলেই পরানের গহিনে লুকিয়ে থাকা ভাষার প্রতি অকুণ্ঠ সেই ভালোবাসা ক্রমশই আচ্ছন্ন করতে থাকে আমাদের মন মনন স্বপ্ন ও হৃদয়। ঘিরে রাখে চেতনার শেকড় থেকে শিখড় অবধি। ভালোবাসার ফেব্রুয়ারি। আমরি প্রিয় বাংলা ভাষা।

ফেব্রুয়ারি এলেই মনে পড়ে গর্বের সেই অতীতের কথা। বেদনাদীর্ণ সকালের কথা। মনে পড়ে আমাদের সে সাহসের গল্প। সেদিন আবেগ ছিল। ভালোবাসা ছিল। দরদ ছিল। ছিল ভাষার প্রতি আজন্ম মমতা। আমাদের ভাগ্যে হাত দেয় ওরা কারা।  মায়ের মুখের বুলিকে কেড়ে নিতে চায় ওরা কোন সে ঘাতক।

বুকভরা রক্ত নিয়ে বাংলার দামাল ছেলেরা সেদিন পা রাখে রাজপথে। মুষ্টিবদ্ধ হাত। ঔদ্ধত তর্জনী। ঝাঁঝালো শ্লোগান। সেদিন সবাই বিপ্লবী বিদ্রোহী। অধিকার আদায়ের চিৎকারে কেঁপে ওঠে সেদিন আকাশ। পদভারে কাঁপে মাটি মৃত্তিকা। অগ্নিশ্লোগানে এগিয়ে যাচ্ছে সবাই। বাংলা মায়ের সন্তানেরা। সবার চোখ মুখ থেকে যেন আগুন ঠিকরে বেরুচ্ছে।

প্রতিশোধের আগুন যেন আজ জ্বালিয়ে ছারখার করে দিবব ওদের সবকিছু। যারা আমাদের মুখের ভাষাকে কেড়ে নিতে চায় তাদের। পরাজিত শত্রু সেদিন গুলি চালায় আমাদের সাহসের বুকে। রক্তে ভেষে যায় রাজপথ। কংক্রিট।এবং ফুটপাত। লুটিয়ে পড়ে সালাম রফিক বরকত জব্বাররা। রক্তেরর ডানায় ভর করে তাদের আত্মার পাখি উড়ে যায় মহাকালের পথ ছাড়িয়ে স্বর্গোদ্যানের দিকে। হাহাকারের বদলে অথৈ পুষ্পে ভরা যায় আমাদের রোরুদ্যান।

হাসনাহেনা গোলাপ জুঁই আর চামেলি শেফালির সে এক অপার মায়াকানন।  অপরূপ সুবাস ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। আমাদের দুঃসহ রৌদ্রতাপে। সবুজ বাংলার পথে-ঘাটে। প্রান্তর থেকে তেপান্তরে। রক্তের সে সুবাস। সে তখন থেকে দিনটি ইতিহাসের। এ ইতিহাস সত্যের।  সাহসের। আবেগের। ভালোবাসার। বুকের রক্ত দিয়ে সেদিন আমরা হতাশ করেছি ওদের। ছিনিয়ে এনেছি বিজয়মাল্য। রক্তের পতাকা। বেদনাবিধুর সেদিনটি ছিল একুশে ফেব্রুয়ারি।

সেদিন এদেশের সব পাখির কণ্ঠে ছিল বিষাদের সুর। পাহাড়ের পাদদেশে বয়ে যাওয়া ঝরনায় ছিল কান্নার কলকল ধ্বনি। শাড়ির আঁচলে মুখ লুকিয়ে অশ্রু ফেলেছিল আমাদের জননীরা। শহীদের রক্ত আর বিয়োগার্তদের আর্তনাদের প্রতি সম্মান জানিয়ে ইতিহাসের সত্যের প্রতি একপৃথিবী শ্রদ্ধা রেখে দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আমরা লিখি মহান একুশে ফেব্রুয়ারি।  ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল এবং চৌষট্টি হাজার গ্রাম ছাড়িয়ে একুশের পতাকা আজ উড়ছে বিপুলা দুনিয়ার পথে পথে। দিকে দিকে। এ প্রাপ্তি আমাদের। আমাদের রক্তের। মাতৃভাষা বাংলার।

ফেব্রুয়ারি এলেই তাই দুহাত তুলি মহান পাকের দরবারে। তাদের জন্য যারা রক্ত বিলিয়েছেন অকাতরে আমাদের এ ভাষার তরে। যাদের ত্যাগ আর শ্রমের কল্যাণে পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে আমাদের ভাষা। আমাদের এবড়ো থেবড়ো এই মানচিত্র। আজ দেখে কষ্ট পাই। শুনে মর্মাহত হই। যখন বহুজাতিক ঐশ্বর্য, মিনার সংস্কৃতি আর দিবস পালনের গড্ডালিকায় পবিত্র প্রার্থনা থেকে বঞ্চিত হন মহান শহীদদের আত্মা।

তাই একুশের সকালে নগ্নপদে মিনারের বেদিতে ফুলঅর্চনা নয় বরং আমাদের প্রার্থনার ফুলঝুরিতে সুবাসিত হোক একুশের শহীদরা। থোকা থোকা ঐশী আয়াতে সেজে ভরে যাক ওদের রক্তে ছোপ লাগা কাফন। জয় হোক আমাদের। আমাদের ভাষার। জয়তু সালাম রফিক বরকত জব্বার।

আরএম/

ad