186489

সৈয়দ কুতুব শহীদ : এক বীরাত্মার জীবনালেখ্য

মূল : হাজী বশীর আহমাদ
অনুবাদ : জাবির মাহমুদ

সৈয়দ কুতুব শহীদ রহ.- এর দীনি, রাজনৈতিক, সাহিত্যিক, সাংবাদিকতা এবং জীবনের আন্দোলনমুখর প্রান্তকে দৃশ্যায়িত করার জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রসারিত জ্ঞান এবং অতল গভীরতর দৃষ্টিশক্তির প্রয়োজন। একজন বিদগ্ধ কলমসৈনিক, মুফাসসির, নির্লাজ সাংবাদিক এবং ইখওয়ানুল মুসলিমিনের নির্ভীক বন্দী হওয়ার সুবাদে মুসলিম বিশ্বের প্রতি তার অবিস্মরণীয় সেবা সর্বদাই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বিজ্ঞ পাঠক মাত্রেরই জানা আছে যে, বিগত তিনশ’ বছরে মুসলিম বিশ্ব বাতিল শক্তির কব্জায় পূর্ণমাত্রায় বন্দী। আর এ কারণে মুসলিম বিশ্ব নিজেদের আত্মমর্যাদাবোধ এবং নির্ভরতার নসীবকে এতোটাই খুইয়ে বসেছে যে, ইম্পেরিয়াল ক্ষমতার দাসত্বে তারা জীবনপাত করতেও প্রস্তুত!

তা সত্ত্বেও সেইসব দেশে কালক্রমে এমন পবিত্রাত্মারাও জন্মেছেন— যারা তাগুতি আইন ও নাপাক ইম্পেরিয়াল ক্ষমতাকে মিটিয়ে দেয়ার জন্য এবং ইসলামি আন্দোলনের অধীনে মুসলিম বিশ্বকে বাহ্যিক হস্তক্ষেপ এবং কব্জা থেকে মুক্ত করানোর জন্য নিজেরদের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে চেষ্টা-প্রচেষ্টার চূড়ান্ত করেছেন। আজও মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তর অংশ ওই বাতিল ও ইম্পেরিয়াল ক্ষমতার কার্যপদ্ধতির শিকার।

মোজমগ্ন, অক্ষম মুসলিম প্রশাসকরাও তাগুতি শক্তির ক্রিড়নক হিসেবে দেশ দেশে ইসলামি আন্দোলনসমূহকে শেকড়চ্যুত করার লক্ষ্যে বিভোর। সেইসব ইসলামি আন্দোনলসমূহের মধ্যে আরব বিশ্বের এক বিরাট আন্দোলন— মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিমুনও৷ যার সমূহ আত্মত্যাগ, ধৈর্য্য, ও অটলতার ইতিহাস পৃথিবীর তাবৎ স্বাধীনতার ইতিহাসকেই হার মানায়৷ বিগত ষাট বছরে ইখওয়ানের সাথে সংযুক্ত ভক্তকূল, সদস্য, বন্দীদেরকে ধারাবাহিকভাবে জুলুম-নির্যাতনের নিশানা বানানো হয়েছে।

রাষ্ট্রযন্ত্র ঐ আন্দোলনকে শেকড় থেকে উৎপাটন করার কাজে কর্মব্যস্ত হয়ে তথাকথিত স্যেকুলারিজমকে সুস্থ করে তুলছিলো। আজ পর্যন্ত ইখওয়ানুল মুসলিমের সাথে সম্পৃক্ত হাজারো লোকদেরকে চূড়ান্ত পর্যায়ের নির্দয়তার সাথে শহীদ করে দেয়া হয়েছে। এবং সংখ্যায় এমন হাজারজন রয়েছেন জেলবন্দী। সেই গেপ্তারকৃত বন্দী জামাতেরই একজন সদস্য সৈয়দ কুতুব শহীদ। যিনি স্বীয় যামানায় ইসলামী আন্দোলন ইখওয়ানুল মুসলিমিনের প্রাণ-স্পন্দন ছিলেন৷

শৈশবের পাঁচালি ও শিক্ষা …

সৈয়দ কুতুবুদ্দিন শহীদ ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে মিশরের এক দীনদার কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা কুরআন মাজিদের ব্যাপারে গভীর আগ্রহ রাখতেন। এজন্য সৈয়দ কুতুব শহীদ রহ. শৈশবেই কুরআন মাজিদ হেফজ করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন৷ প্রাথমিক শিক্ষা মিশরের একটি প্রাইমারি স্কুল থেকেই অর্জন করেন। মাধ্যমিক স্তর পার করেন প্রসিদ্ধ কলেজ দারুল উলূম কাহেরায়। ১৯৩৩ সালে স্নাতক ডিগ্রী লাভের পর ডিপ্লোমার ডিগ্রী অর্জন করেন।

সূর্যকে আলোহীন করার ব্যর্থ চক্রান্ত…

দীনের ব্যাপারে তুমুল আগ্রহ, অত্যাচার ও যেকোনো দমনমূলক পদক্ষেপের প্রতি ঘৃণা এবং মিশেল প্রকৃতির হওয়ার কারণে শিক্ষাকাল থেকেই বাতিল প্রশাসনের নীতির ব্যাপারে বীতশ্রদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন৷ একপর্যায়ে জনসাধারণের উপর আব্যাহত অত্যাচার এবং নীপিড়নের বিপরীতে ইখওয়ানুল মুসলিমুনের প্রতিবাদি আকাঙ্খার পাঠ নিতে থাকেন।

সৈয়দ কুতুবকে আন্দোলন থেকে দূরে রাখা এবং উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য দেশীয় শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের পক্ষ থেকে বিদেশে শিক্ষার্জনের জন্য আমেরিকা পাঠিয়ে দেয়া হয়। যেখানে থেকে তিনি পশ্চিমা সংস্কৃতির উপাদান ধ্বংসকারীদের স্বচক্ষে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখেন! আমেরিকা থেকে পত্যাবর্তনের পর তিনি পূর্ব বিশ্বের কবি ডক্টর মুহাম্মদ ইকবাল রহ.-এর এই কবিতার উপর আমল করা শুরু করে দেন—

“নিজ গোত্রের কিয়াস পশ্চিমা গোত্রসমূহের সাথে করো না,
কিয়াসের জন্য তো সর্বোত্তম রাসূলের হাশেমী সম্প্রদায়।”

মুস্তাকিম প্রাপ্তি ও তার দায়…

আমেরিকা থেকে জন্মভূমি মিশরে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি পুনরায় ইখওয়ানুল মুসলিমিনের দিকে মনোযোগী হন। প্রাথমিক পর্যায়ে আন্তরিকতার সাথে সংযুক্ত থাকেন। অতঃপর নিয়মতান্ত্রিকভাবেই সংগঠনে শরিক হয়ে যান। ১৯৫৩ সালে সংগঠনের সদস্যপদ লাভ করেন।

ইখওয়ানী আন্দোলনের সাপ্তাহিক সংবাদপত্র “খিদমাতুদ দাওয়াহ” এ নিজের পতিক্রিয়াশীল লেখালেখির মাধ্যমে তিনি আল্লাহর বান্দাদেরকে ইসলামের দিকে আহবান করতে থাকেন। বাতিল পূজারীদেরকেও চিৎকার করে আহবান করেন।

তিনি তার লেখালেখির প্রতিফল পাওয়ায় উপযুক্ত একটা সময় পর্যন্ত লেখালেখিতে সক্রিয় থাকেন। পরবর্তীতে তাকে ইখওয়ানুল মুসলিমুনের প্রচার সম্পাদক শাখার সেক্রেটারি বানিয়ে দেয়া হয়। কেন্দ্রীয় প্রোগ্রাম চলাকালে সৈয়দ কুতুবের ইসলামী রচনাকে ইংরেজী, ফ্রেন্স, ইন্দোনেশীয় এবং অপরাপর ভাষায় অনুবাদ করিয়ে জনসাধারণ পর্যন্ত পৌঁছানো হয়।

তার ফলস্বরূপ মিশরে জামাল নাসেরের দাজ্জালি প্রশাসন ইখওয়ানকে বেআইনি ঘোষণা করে। এর কিছুকাল পর যখন ইখওয়ানের কার্যক্রম কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে— তখন সৈয়দ কুতুব শহীদকে ইখওয়ানুল মুসলিমুনের সম্পাদক বানানো হয়।

তিনি তখন ইখওয়ানের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সেক্রেটারি পদে থেকে জনযোগাযোগের দায়িত্বও আঞ্জাম দিচ্ছিলেন। ইসলামি আন্দোলনের একজন সদস্য হওয়ার পাশাপাশি সৈয়দ কুতুব শহীদ রহ. একজন বিদগ্ধ সাহিত্যিকও ছিলেন।

তার নির্লাজ কলম নিসৃত লাগামহীন রচনায় আল্লাহ তাআলা এমন পতিক্রিয়া এবং প্রাণশক্তি প্রদান করেছিলেন— যদ্দরুন কেবল মিশরই নয় বরং পৃথিবীব্যাপী বাতিল ঘরসমূহ তোলপাড় সৃষ্টি হয়ে যায়।

সৈয়দ রহ. মাযহাব, সাহিত্য, সাংবাদিকতা, রাজনীতি এমনকি প্রতিটি সেক্টরেই পৃথক লেখনি এবং একটি স্বতন্ত্র স্টাইল অবলম্বন করতেন। এবং ইম্পেরিয়াল ক্ষমতাকে ব্যাবহার করার চিন্তাগত এবং তাত্ত্বিক বলে ছিলেন শক্তিমান! ফলশ্রুতিতে জীবনের বড় একটি অংশই বন্দীশালায় কাটে তার।

কলমের ময়দানে প্রজ্ঞার জঙ্গ

তিনি অনেকগুলো বই রচনা করেন— ইসলাম মে আদলে ইজমায়ী, মানাযিরে কিয়ামত, আমনে আলম আওর ইসলাম, ইসলাম কা রোশনাঈ উল্লেখযোগ্য।

তার প্রসিদ্ধ রচনা— মাআনিল ফিত তারিক। যার উর্দু অনুবাদ মাওলানা এনায়েতুল্লাহ সুবহানী “নুকুশে রাহ” নামে করেছেন। এটাই সেই ঐতিহাসিক গ্রন্থ যেটা লেখার জেরেই সৈয়দ কুতুব রহ. কে ফাঁসির কাষ্টে ঝোলানো হয়! তার রচিত তাফসির “ফি যিলালিল কুরআন” বর্তমান সময়ে কুরআন মাজিদের উত্তম তাফসিরগুলোর মধ্য থেকে একটি।

জামালের ফেরাউনী, কুতুবের হুঙ্কার

ইসলামের প্রকৃত পয়গামকে ব্যাপক করা, সঠিক দীনের দাওয়াত প্রদান এবং স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার বিরুদ্ধে চেষ্টা-সংগ্রাম জারি রাখার ভিত্ত্বিতে সৈয়দ কুতুব শহীদকে ১৫৫৪ সালে গ্রেফতার করে, এমন বেদনাদায়ক শাস্তি দেয়া হয় যে, তার সুস্থতা অনেক বাজেভাবে ব্যাহত হয়। জেলমুক্তির পর বিভিন্ন বিষয়ে সম্পৃক্তি সত্ত্বেও ওই শক্তিমানবের অটল কদম সামান্য পরিমাণও দৃঢহীন হয় নি!

১৯৬৫ সালের এপ্রিলে তাকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয়। এবং জামানার ফেরাউন জামাল নাসের সৈয়দ কুতুব রহ. এর উপর বিভিন্ন প্রকার আরোপিত অপরাধের অভিযোগে তাকে ফাঁসের দন্ডে দন্ডিত করে। কিন্তু আপিল করার কোনো সুযোগ তাকে দেয়া হয় নি!

ওই সময় সৈয়দ কুতুব শহীদ রহ. বলেছিলেন— “আমি জানি যে, এইবার প্রশাসন আমার মস্তক চায়। আমার উপর দন্ডিত শাস্তির দ্রুত বাস্তবায়ন কামনা করে। আমার এই শাস্তির উপর না কোনো লজ্জা আছে, আর না মৃত্যুর উপর কোনো প্রকার আফসোস। আমার তো সৌভাগ্য যে, আমার দাওয়াতে ইসলামের পথে মৃত্যু নসীব হচ্ছে। এখন এই বিষয়ের সিদ্ধান্ত তো ভবিষ্যতের কোনো ইতিহাসবিদ করবেন যে, সঠিক পথের উপর আসলে কে ছিলো! ইখওয়ান না প্রশাসন!”

নক্ষত্রের পতন

মিশরের প্রশাসন নিজেদের ধার্যকৃত সিদ্ধান্তের উপর জনপ্রতিবাদ এবং মুসলিম বিশ্বের নেতৃবৃন্দদের পক্ষ থেকে দয়ার আপিল করা সত্ত্বেও ১৯৬৬ সালের আগস্টে একদিন ফজরের পূর্বে সৈয়দ কুতুব রহ. কে ফাঁসির কাষ্টে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। সৈয়দ কুতুব শহীদ রহ. শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করে এই বিষয়টি পরিস্কার করে দেন যে, প্রকৃত বীরেরা কখনো বাতিলের সামনে মাথানত করে না। এবং মরেও অমর থেকে যায়!

আরএম/

ad