187242

একান্ত সাক্ষাৎকার : ‘আমেরিকায় মুসলিমদের মধ্যে দলাদলি নেই’

লালমনিরহাটের জোবায়ের হাসান যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছেন প্রায় অর্ধযুগ হতে চলেছে। তরুণ এই আলেম যতটুকু ইলম অর্জন করেছেন তা থেকে দূরের ইলম-পিপাসুরাও যেন বঞ্চিত না হয়, এই তাগাদায় বাংলাদেশ থেকে ছুটে গিয়েছেন সুদূর সেখানে। দেশটির রাজধানী নিউইয়র্কে অবস্থিত বৃহৎ ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘দারুল উলুম নিউইয়র্ক’-এ দীনের খেদমত আঞ্জাম দিচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে।

মাওলানা জোবায়ের হাসান পড়াশোনা করেছেন ঢাকার স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান উত্তরার বাইতুস সালাম মাদরাসায়। সম্প্রতি জোবায়েরের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইসলাম ও মুসলিমদের নিয়ে নানাবিধ আলাপ করেছেন তার তারুণ্যের সহপাঠী ও আওয়ার ইসলামের কন্ট্রিবিউটর বেলায়েত হুসাইন। আলাপচারিতায় উঠে এসেছে সেখানকার ইসলাম ও ইসলামি শিক্ষার নানা বিষয়। আওয়ার ইসলাম পাঠকদের জন্য তার চুম্বকাংশ তুলে ধরা হল-


আওয়ার ইসলাম: প্রায় অর্ধযুগ ধরে আপনি আমেরিকায় কুরআন-সুন্নাহর পাঠদান করছেন,  দেশটির ইসলামের জন্য প্রতিকূল এই পরিস্থিতিতে দীনের বড় এই খেদমদটি সম্পর্কে আপনার অনুভূতি জানতে চাই!

জোবায়ের হাসান: আসলে শুরুতে আমেরিকা সম্পর্কে আমারও নেতিবাচক ধারণাই ছিল। কিন্তু নিউইয়র্কে যেখানে আমাদের বাসা প্রথমদিন এসেই আমি চমকে যাই। কানে এসে বেজে ওঠে সুমধুর কণ্ঠের আজান।

পরে নামাজে গিয়ে দেখি বিশাল বড় মসজিদ এবং মাগরিবের নামাজেই প্রায় চার শতাধিক মুসল্লির উপস্তিতি- এটা আমার খুব ভাল লাগে। পরে জানতে পারি যেসব মুসলিম পরিবার আমেরিকায় আসে তারা তাদের সন্তানদের ইসলামি সংস্কৃতির সঙ্গে জুড়ে দিতে বেশ সতর্ক থাকেন।

নিজ নিজ দেশে অতোটা ইসলামি অনুশাসন না মানলেও এখানে এসে তার প্রয়োজন অনুভব করতে পারে তারা। এজন্য আমরা যেসব শিশুদের পড়াই তারা এবং তাদের পরিবার আমাদের যথেষ্ট মূল্যায়ন করে। এখানে সবার পরিচয় একটাই ‘মুসলিম’। কোন উপদল নেই। সেই হিসেবে এখানে দীনের খেদমত করাটাকে আমি খুব উপভোগ করছি আলহামদুলিল্লাহ!

আওয়ার ইসলাম: আমেরিকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম কমিউনিটির বসবাস। ইসলামের প্রতি তাদের আন্তরিকতা কেমন? যেসব পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের মাদরাসায় পাঠান, মূলত সন্তানদের মাদরাসায় পাঠাতে কোন জিনিস তাদের উদ্বুদ্ধ করে?

জোবায়ের হাসান: বললাম, এখানে কোন উপদল নেই, কোন দলাদলি নেই। সবাই মুসলিম পরিচয়ে বসবাস করে। বিভিন্ন সময়ে আমেরিকায় আরব দেশ থেকে শায়েখরা আসেন দীনের দাওয়াত দিতে। অনেক সময় তাদের বেশভূষা সুন্নাতের সঙ্গে মানায় না, তারপরও এরকম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কমতি নিয়ে কেউ প্রশ্ন করেনা। সবাই চায়, ইসলামের আলো কিছুটা হলেও ছড়িয়ে পড়ুক।

আর পিতামাতা সন্তানদের ইসলামি শিক্ষার প্রতি উৎসাহ দেন যেন তারা তাদের শিকড় ভুলে না যায়। অন্তত ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহ জানাকে সন্তানের জন্য খুব বেশি প্রয়োজনীয় মনে করে তারা। কারণ, তাদের স্রোতের বিপরীতে চলতে হয়। তারা জানে যে, অন্তত পারিবারিক বন্ধনটা ঠিক রাখতে হলেও ইসলামি শিক্ষার বিকল্প নেই। অথচ, এসব পরিবারই যখন নিজ নিজ মুসলিম দেশে বসবাস করেছে তখন এর প্রয়োজনীয়তা ততোটা উপলব্ধি করতে পারেনি।

আওয়ার ইসলাম: আমরা জানি, আধুনিকতার নামে ইউরোপ-আমেরিকান নারীরা রাস্তাঘাটে অর্ধলোঙ্গ হয়ে চলাফেরা করে, এই পরিবেশে একজন রক্ষণশীল মুসলিম হিসেবে আপনি কীভাবে চলাফেরা করেন?

জোবায়ের হাসান: আমেরিকা মোটামুটি একটি স্বাধীন দেশ। চলাফেরার ক্ষেত্রে সবাই নিজস্ব স্বাধীনতা ভোগ করে। এখানে অর্ধলোঙ্গ হয়ে চলাফেরা করাটা যেমন আছে, ঠিক তেমনি আপাদমস্তক আবৃত করে চলাফেরা করে এমন অসংখ্য মুসলিম নারীকেও রাস্তায় দেখা যায়। যাদের অনেকের হাত ও পা কালো মোজা দিয়ে ঢাকা থাকে। এখানের সবাই খুব ব্যস্ত। কারো দিকে ভাল করে তাকানোর সময় কই?

আওয়ার ইসলাম: আমেরিকার মাদরাসাসমূহ শিক্ষা-সিলেবাস ও আনুষাঙ্গিক ক্ষেত্রে কাদের অনুসরণ করে? হেফজ বিভাগে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদান পদ্ধতি ও রুটিন কি?

জোবায়ের হাসান: দেশটিতে দীনের দাওয়াতের জন্য আরবদের বিভিন্ন সংগঠন এসে কাজ করে। কিন্তু ইসলামি শিক্ষার ক্ষেত্রে এখানে দেওবন্দি ওলামায়ে কেরামের ভূমিকা অতুলনীয়।

এখানের দীনি প্রতিষ্ঠানগুলোর উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের দেওবন্দপন্থী ওলামায়ে কেরাম প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং তারাই কোমলপ্রাণ শিক্ষার্থীদের পাঠাদানের মাধ্যমে নিরলসভাবে ইসলাম প্রসার ও দাওয়াতের ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখছেন।

আর এখানের সব মাদরাসাই অনাবাসিক। হেফজখানার ক্লাস শুরু হয় নয়টা থেকে এবং পাঁচটায় ছুটি হয়। এই সময়ের মধ্যেই তারা সবক, সাতসবক ও আমুখতা শোনায়। তবে আশ্চর্যের কথা হলেও অনাবাসিক থাকার পরেও বাচ্চাদের স্মরণশক্তি প্রশংসাযোগ্য।

আওয়ার ইসলাম: শুধুমাত্র ইলমি খেদমত ও ইসলাম প্রসারের কাজে বাংলাদেশি আলেমদের জন্য আমেরিকা ভূখণ্ড কি উপযোগী? আপনি এখানে এতোদিন খেদমদ করছেন, আপনার প্রাপ্তি কি?

জোবায়ের হাসান: আমেরিকা ইসলাম প্রচার ও প্রসারের উর্বর ভূখণ্ড। যাদের সুযোগ আছে তাদের জন্য এসব দেশে আসাটা অবশ্যই জরুরি। এদেশে শুধুমাত্র উন্নত জীবনযাপনের উদ্দেশ্যে আসব- এই ধারণা থেকে অন্তত আলেম ওলামাদের বেঁচে থাকা উচিত মনে করি।

আসলে একসময় দেশে থাকতে বিষয়টির প্রতি আমারও তেমন গুরুত্ব ছিল না। ভাবতাম, কোন মতো নিজে ভাল কাজ করে গেলেই হল। নাজাত পেয়ে যাব। কিন্তু আমেরিকায় এসে আমার চোখ খুলেছে যে, আমারও মুসলিম উম্মাহর হেদায়েতের জন্য কিছু করা দরকার। আল্লাহ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ইলম হাসিলের পরও কেন তোমার ভাইদের শিখাওনি তখন আমি কি উত্তর দিব?

এখানে আমার প্রাপ্তি বলতে আমি নিজেকে উপলব্ধি করতে পেরেছি। আর পার্থিব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে আত্মিক প্রশান্তিও এখন অনুভূত হয়।

আওয়ার ইসলাম: আমেরিকায় ইসলামের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার মতামত জানতে চাই! এ ব্যাপারে কোন আশার আলো দেখতে পান?

জোবায়ের হাসান: ভাল একটি প্রশ্ন করেছেন। হয়তো জানবেন পুরো মানব সমাজ আজ শান্তির জন্য অস্থির। ইউরোপ আমেরিকায় আত্মিক অশান্তির মাত্রাটা মুসলিম দেশগুলোর তুলনায় খুব বেশি। যারা একটু সচেতন তারা ধর্মের প্রতি ফিরে আসতে শুরু করছে। বিধর্মীরা ইসলাম সম্পর্কেও জানছে। আর প্রায় প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছে।

ইসলামের সাম্য ও ইনসাফের ব্যাপারে জানার পরে তারা মুসলিম হওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। এই অবস্থার মধ্যে যদি আমরা এসব দেশে দাওয়াতি কার্যক্রম বৃদ্ধি করতে পারি, তাহলে নওমুসলিমদের সংখ্যাটা দিনদিন বাড়বে। এটা তো আশার আলো দেখার খবরই, তাইনা?

আরএম/

ad