সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪ ।। ৯ বৈশাখ ১৪৩১ ।। ১৩ শাওয়াল ১৪৪৫


যে ১০ কারণে সব দেশে একই দিনে রোজা ও ঈদ পালন সম্ভব নয়


নিউজ ডেস্ক

নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: আওয়ার ইসলাম

|| হাসান আল মাহমুদ ||

রোজাঈদ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ  দুই ইবাদাত। সমগ্র বিশ্বের মুসলমান এই দুই ইবাদত গুরুত্ব সহকারেই পালন করে থাকে।  স্বাভাবিকভাবেই এই দুই ইবাদত সমগ্র বিশ্বে একই সাথে পালিত হয় না।কোথাও একদিন আগে পালন হয়, কোথাও পালন হয় এক দিন পরে। তবে, কেউ কেউ প্রশ্ন ছুঁড়ে- কেন এই অমিল, সমগ্র বিশ্বের সব দেশের মুসলমান কেন এক সাথে এই দুই ইবাদাত পালন করতে পারে না?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্বের পরিমন্ডলে একই সময়ে কোথাও দিন হয় আবার কোথাও হয় রাত। কোথাও বিকেল হলে অন্য জায়গায় ঠিক একই সময়ে দেখা যাচ্ছে সন্ধা। কোথাও শীত হলে অন্যখানে দেখা যায় গরম। তাই, যেভাবে পাঁচ ওয়াক্ত নামায সারা বিশ্বের মানুষ একই সাথে পালন করতে পারে না, বরং ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আদায় করে থাকে, তদ্রুপ রোজা ও ঈদও নিজ নিজ অঞ্চলে চাঁদ দেখা সাপেক্ষে পালন করে থাকে মুসলমানরা।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে- সারা বিশ্বের সব দেশে একই দিনে রোজা ও ঈদ পালন কেন সম্ভব নয় এ ব্যাপারে অন্যতম ১০ টি কারণ গুরুত্বপূর্ণ। যেমন-

এক. যুক্তি অনির্ভর

তথ্য-প্রযুক্তির কল্যাণে একই দিনে ঈদ পালনের যুক্তি দাঁড় করা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, ১০০ বছর আগেও যখন উপগ্রহ (স্যাটেলাইট) ছিল না, তাহলে কি এক হাজার ৩০০ বছর ধরে যেদিন রোজা রাখা নিষিদ্ধ, সেদিন তথা ঈদের দিনেও রোজা রাখা হতো? শুধু প্রযুক্তিগত সুবিধার অভাবে এমনটা হতো? মহান আল্লাহ কি কিয়ামতের দিন মুসলিম উম্মাহর এক হাজার ৩০০ বছরের আমল ভুল ও বাতিল বলে ঘোষণা করবেন?

দুই. পাঁচ ওয়াক্ত নামায সব দেশে এক সাথে পড়া যায় না

সর্বক্ষেত্রে সৌদি আরব বা আন্তর্জাতিক অভিন্ন সময় মানা হলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বেলায় কী হবে? অঞ্চলগত ব্যবধানে দেখা যায়, আমরা যখন ফজরের নামাজ আদায় করি, সৌদির মানুষ তখন ঘুমিয়ে। আমাদের দেশে যখন এশার ওয়াক্ত, তখন ওই দেশে আসরের ওয়াক্ত শেষ হয় না। মাসের ক্ষেত্রে এক-দুই দিনের পার্থক্য খুবই স্বভাবিক নয় কি?

তিন. বিজ্ঞান অসমর্থিত

ইসলামে মাসের সময় নির্ধারক হলো চাঁদ, দিনের সময় নির্ধারক সূর্য। ঈদ, রোজা ইত্যাদির সময়কাল নির্ধারিত হয় চন্দ্রোদয়ের হিসাবে। রোজা/ঈদ পালনের Natural cycle (প্রাকৃতিক চক্র) অস্বীকার করা অবৈজ্ঞানিক। কোনো স্থানে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে যেমন দিনের শুরু হয়, তেমনি অমাবস্যার পর চন্দ্রোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে মাস গণনা শুরু হয়ে যায়।

চার. আলেমেদের ইজমা

উদয়স্থলের বিভিন্নতা বেশির ভাগ আলেমের কাছেই গ্রহণীয়। ইমাম ইবনু আব্দিল বার এ বিষয়ে ‘ইজমা’ (মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত ঐকমত্য) উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন যে ‘দূরবর্তী শহর থেকে একই সময়ে চাঁদ দেখা যায় না। যেমন—স্পেন ও খোরাসানের মধ্যকার দূরত্ব বা ভৌগোলিক ব্যবধান।

পাঁচ. নববী যুগের আমল

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাঁদ দেখার জন্য অথবা চাঁদের সংবাদ বা সাক্ষ্য সংগ্রহ করার জন্য এক/দুই দিন দূরত্ব নয়; পাঁচ-দশ মাইল দূরত্বের কোনো এলাকায়ও কোনো লোক পাঠিয়েছেন? হাদীস, সীরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থাবলীতে এর একটিও কি দৃষ্টান্তও কেউ দেখাতে পারবে না।

এখানে একটি বিষয় বুঝতে হবে যে, এক হল সাক্ষ্য এসে গেলে সাক্ষ্য কবুল করা, আরেক হল সাক্ষ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা করা, দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। একই হিলাল এবং প্রথম হিলালের ভিত্তিতে রোযা ও ঈদ করা যদি কুরআন ও হাদীসের নির্দেশ হয়ে থাকে তাহলে অন্যান্য অঞ্চল থেকে নতুন চাঁদের সংবাদ এবং সাক্ষ্য সংগ্রহ করাও তো ফরয হবে। কিন্তু নবী-যুগে এর উপর আমল হল না কেন? এসে যাওয়া সাক্ষ্য গ্রহণেই কেন ক্ষ্যান্ত থাকা হল?

ছয়. সাহাবায়ে কেরামের আমল

হাদীসের বিখ্যাত কিতাব তিরমিযী শরীফে ইমাম তিরমিযী রাহ. স্বতন্ত্র একটি অধ্যায় এনেছেন, যার শিরোনাম দিয়েছেন- باب ما جاء لكل أهل بلد رؤيتهم

অর্থাৎ প্রত্যেক অঞ্চলের লোকেরা তাদের চাঁদ দেখা অনুযায়ী রোযা-ঈদ পালন করবে। এই অধ্যায়ে তিনি সহীহ সনদে একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন। হাদীসটি এই-

عن كريب أن أم الفضل بنت الحارث، بعثته إلى معاوية بالشام قال: فقدمت الشام، فقضيت حاجتها، واستهل علي هلال رمضان وأنا بالشام، فرأينا الهلال ليلة الجمعة، ثم قدمت المدينة في آخر الشهر، فسألني ابن عباس، ثم ذكر الهلال، فقال: متى رأيتم الهلال، فقلت رأيناه ليلة الجمعة، فقال: أأنت رأيته ليلة الجمعة؟ فقلت: رآه الناس، وصاموا، وصام معاوية، قال: فقلت: ألا تكتفي برؤية معاوية وصيامه، قال: لا، هكذا أمرنا رسول الله صلى الله عليه وسلم

অর্থাৎ বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত কুরাইব রাহ. কে উম্মুল ফযল বিনতুল হারিছ রাযি. কোন একটি কাজে দামেস্ক, যা তখন ইসলামী খেলাফতের রাজধানী ছিল, সেখানে পাঠান। তখন আমীরুল মুমিনীন ছিলেন হযরত মুআবিয়া রাযি.। তো দামেস্কে শুক্রবার চাঁদ দৃষ্টিগোচর হওয়ায় আমীরুল মুমিনীনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক একদিন আগে রমযান শুরু হয়। তো কিছুদিন পর হযরত কুরাইব কাজ শেষে মদীনায় ফিরে আসলে তিনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি.কে দামেস্কে শুক্রবার চাঁদ দৃষ্টিগোচর হওয়ার সংবাদ প্রদান করেন। ইবনে আব্বাস রাযি. সেদিকে মোটেই দৃষ্টিপাত করেননি। বরং তিনি বলেছেন-

لكن رأيناه ليلة السبت، فلا نزال نصوم حتى نكمل ثلاثين يوما، أو نراه،

আমরা তো শনিবার সন্ধ্যায় হিলাল দেখেছি। এইজন্য আমরা ত্রিশ রোযা পূর্ণ করব। তবে নিজেরা যদি হিলাল দেখি সেটা ভিন্ন কথা। তাকে জিজ্ঞাসা করা হল-

ألا تكتفي برؤية معاوية وصيامه، قال: لا، هكذا أمرنا رسول الله صلى الله عليه وسلم

মুআবিয়া রাযিআল্লাহু আনহুর হিলাল দেখা এবং রোযা রাখা কি আপনি যথেষ্ট মনে করেন না?

তিনি বললেন, না, আমাদেরকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবেই আদেশ করেছেন। (সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৬৯৩)

ইমাম তিরমিযী রাহ. হাদীসটি বর্ণনা করার পর বলছেন-

والعمل على هذا الحديث عند أهل العلم أن لكل أهل بلد رؤيتهم.

অর্থাৎ প্রত্যেক অঞ্চলের লোকেরা স্ব স্ব চাঁদ দেখার ভিত্তিতে রোযা/ঈদ পালন করবে, এর উপরই সকল উলামায়ে কেরাম আমল করে আসছেন। এই হাদীসটি তিরমিযী শরীফ ছাড়াও মুসলিম শরীফেও এসেছে। হাদীস নং- ১০৮৭

সাহাবায়ে কেরামের এই আমল থেকে স্পষ্টভাবে জানা যায়, এক দেশের চাঁদ অন্য দেশের জন্য রোজা ও ঈদের দলিল নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত সে দেশে চাঁদ দেখা না যায়। তাই নিজ দেশে চাঁদ না দেখে সৌদি আরবের সঙ্গে মিলিয়ে রোজা রাখা বা ঈদ করার ধর্মীয় এখতিয়ার কারো নেই। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যেদিন তোমরা সবাই রোজা রাখবে সেদিনই রোজা, যেদিন তোমরা সবাই রোজা ভঙ্গ করো সেদিনই হচ্ছে ঈদুল ফিতর এবং যেদিন তোমরা সবাই কোরবানি করো সেদিনই হচ্ছে কোরবানি।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৬৯৭)

সাত. নববী যুগ থেকে বর্তমান যুগ পর্যন্ত মুসলমানদের কর্মধারা

ইসলামের বয়স প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ বছর হতে চলেছে। ইসলাম প্রায় এক হাজার বছর পর্যন্ত বিশ্ব শাসন করেছে। এই সুদীর্ঘ ইতিহাসে কোন অঞ্চলের মুসলমানরা সারা বিশ্বে একই দিনে রোযা বা ঈদ পালনের জন্য কোন চিন্তা করেছেন বা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। এর কোন ইতিহাস নেই। প্রত্যেক অঞ্চলের মুসলমানরা স্ব স্ব অঞ্চলের চাঁদ দেখার ভিত্তিতে রোযা/ঈদ পালন করেছেন। এটাকে তারা কোন সমস্যা মনে করেননি। যদি সারা বিশ্বে একই দিনে রোযা বা ঈদ পালন জরুরী বা কমপক্ষে উত্তম কোন আমল হতো তাহলে ৬৯/৭০ বছর আগ পর্যন্তও কেন এ ব্যাপারে কোন আওয়াজ উঠলো না? এর দ্বারাই বিষয়টির বাস্তবতা বুঝে আসে।

আট. সারা বিশ্বে একই নিয়মে ঋতুচক্র আবর্তিত হয় না

সাগরপারে জোয়ার-ভাটা স্থানীয় সময় অনুসারে হয়, যার সম্পর্ক চাঁদের সঙ্গে। পৃথিবীর সর্বত্র জোয়ার-ভাটা একই সময়ে হয় না। সারা বিশ্বে তো একই নিয়মে ঋতুচক্র আবর্তিত হয় না। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষাকাল বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে শুরু হয়। যদি বিশ্বের কোথাও চাঁদ দেখামাত্রই সারা বিশ্বে ঈদ পালন যৌক্তিক হয়, তাহলে প্রশ্ন থাকে চাঁদ তো পশ্চিমাকাশে প্রথম উদিত হয় বিশ্বের সর্বপশ্চিমের ভূখণ্ড আমেরিকার আলাস্কা প্রদেশে? সৌদি আরবে নয়।

এতে পরিষ্কার বোঝা গেল, চান্দ্রমাস দেশে দেশে আলাদা এবং ঈদ, রোজাও এ জন্য একই দিনে বা একসঙ্গে হয় না বা হওয়া সম্ভব নয়।

নয়. রোজা শুরু অন্য দেশের চাঁদ উদয়ের খবরে আর সাহরি-ইফতার স্থানীয় সময়ে?

সাহরি ও ইফতার সম্পর্কে কোরআনের আয়াত দেখুন—মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ রাতের কৃষ্ণরেখা থেকে উষার শুভ্ররেখা প্রতিভাত না হয়। এরপর তোমরা রাতের শুরু (সূর্যাস্ত) পর্যন্ত রোজাকে পূর্ণ করো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৭)

এখানে দেখা যায়, সাহরি ও ইফতারের বিধান চাঁদকে কেন্দ্র করে। তাহলে এটা বলার সুযোগ নেই যে সুরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াত চাঁদের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং ১৮৭ নম্বর আয়াত সূর্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যদি তা-ই হয়, তাহলে প্রশ্ন থাকে, মানুষ কি রোজা শুরু করবে অন্য দেশের চাঁদ উদয়ের খবরে? আর সাহরি ও ইফতার করবে স্থানীয় সময় অনুযায়ী? এটা হতে পারে না।

দশ. আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ কমিটি’র সিদ্ধান্ত

সব শেষে ‘আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ কমিটি’র সিদ্ধান্ত হলো, ‘বিশ্বব্যাপী একই দিনে সিয়াম ও ঈদ পালনের আহ্বান জানানোর কোনো প্রয়োজন নেই। বরং মুসলিম দেশগুলোর দারুল ইফতা (ফতোয়া বিভাগ) ও বিচার বিভাগের ওপর চাঁদ দেখার বিষয়টি ছেড়ে দেওয়া উত্তম। এতে মুসলিম উম্মাহর জন্য অধিকতর কল্যাণ নিহিত আছে।’ (ইসলামী ফিকহ একাডেমি : ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৮১; রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামী, জেদ্দা, সৌদি আরব)।

হাআমা/


সম্পর্কিত খবর


সর্বশেষ সংবাদ