সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪ ।। ৯ বৈশাখ ১৪৩১ ।। ১৩ শাওয়াল ১৪৪৫


তাবলিগের বেনজির খতিব

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

|| লাবীব আব্দুল্লাহ ||

মাওলানা মুহাম্মদ ওমর পালনপুরী রহ. দাওয়াত ও তাবলিগের এমন একজন ব্যক্তিত্ব যিনি হযরতজী ইউসুফ রহ.-এর পরামর্শে জীবন যাপন করেছেন। পড়ালেখা করেছেন তাঁর নির্দেশনায় দেশ-বিদেশে দাওয়াতের কাজে বের হয়েছেন তাঁরই রাহবরিতে। তিনি এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি সবার প্রিয়পাত্র ছিলেন। 
তিনি কুরআনে কারিমের এমন আশেক ছিলেন যে, মাওলানা হওয়ার পর দাওয়াত ও তাবলিগের কাজের ফাঁকে ফাঁকে নিজে নিজে কুরআনের হাফেজ হয়েছেন। যিনি বয়ান করার শুরুতে কুরআন থেকে দীর্ঘ বয়ান পেশ করতেন। তাঁর তেলাওয়াত ছিল হৃদয়গ্রাহী। তিনি উলামায়ে কেরামের মাঝে এমন আবেগময় ভাষায় বয়ান করতেন যার তুলনা নেই। অনেক সময় তিনি শুধু কুরআনের আয়াত দিয়েই বয়ান করতেন। ৩/৪ ঘণ্টা বয়ান করলেও তন্ময় হয়ে শুনতেন দাঈরা।

পালনপুরী রহ. শৈশবে পিতাকে হারান। মা ইয়াতিম অবস্থায় লালিত পালিত হন। পিতা ছিলেন ব্যবসায়ী। সাত বছরে পিতাকে হারিয়ে পারিপার্শ্বিক দূরাবস্থায় পতিত হন। মা ছিলেন দীনদার। শৈশবে নবীদের গল্প শোনাতেন। দীনদারির মেজাজ তৈরিতে মায়ের ভূমিকা ছিল অকল্পনীয়। জন্ম যদিও ভারতের পালনপুর শহরে কিন্তু পিতার ব্যবসায়ী কাজের সুবিধার্থে পরিবারের সদস্যরা থাকতেন মুম্বাইয়ে। পালনপুরী রহ.-এর শিক্ষা-দীক্ষার প্রধান দায়িত্ব পালন করেছেন মা। তার আম্মা গ্রামের একজন উস্তাদ শায়খ আব্দুল হাফিজ জালালপুরী রহ.-এর কাছে পড়ার জন্য পাঠালেন। মাস শেষে ছেলের কাছে পাঁচ রুপিয়া দিয়ে উস্তাদদকে দিতে বলতেন। উস্তাদ ছিলেন আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল। টাকার প্রয়োজন ছিল, এরপরও টাকা না দিয়ে কেঁেদ কেঁদে বললেন- ‘আমি ওমরকে শিক্ষা দিচ্ছি আখেরাতের জন্য, দুনিয়ার জন্য নয়।’

১৯৪৪ সালে তাঁর উস্তাদ প্রিয় ছাত্র পালনপুরীকে পৃথিবীখ্যাত দীন ও আজাদির কেন্দ্র দারুল উলুম দেওবন্দে নিয়ে আসেন। ভর্তি পরীক্ষা নেন বিশিষ্ট আরবি সাহিত্যিক মাওলানা ই’যায আলী রহ.। ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন সফলভাবে। পালনপুরী ছিলেন মেধাবী ও পরিশ্রমী ছাত্র। দৈনিক ২০ ঘণ্টা পড়েছেন। অভাবী ছিলেন মাঝে মাঝে লাইট পোস্টের বাতিতে পড়তেন তেলের অভাবে। ছাত্র জীবনেই দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ করতেন। দেওবন্দে পড়াকালীন গ্রামে গিয়ে গিয়ে দাওয়াত দিতেন। রমজানের ছুটিতে চিল্ল¬া দিয়েছেন। শারীরিক অসুস্থতা ও পারিবারিক সমস্যার কারণে মাঝে মাঝে পড়াশোনা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে। কিছুদিন এক মসজিদে ইমামের দায়িত্ব পালন করেন। তখন ১৯৫২ সাল। ১৯৪৬ সালে বিয়ে করেন। ১৯৫২ সালে তাঁর পরামর্শদাতা ও মুরব্বি হজরতজী ইউসুফ রহ.-এর মাশওয়ারা অনুযায়ী এক চিল্ল¬ার জন্য বের হন আল্লাহর পথে।

১৯৫৫ সালে হজরতজি ইউসুফ রহ.-এর পরামর্শে পড়াশোনা শেষ করার জন্য আবার ভর্তি হন দারুল উলুম দেওবন্দে। শায়খুল ইসলাম হোসাইন আহমদ মাদানী রহ.-এর কাছে হাদিস পড়েন। দেওবন্দে থাকা অবস্থায় ১৯৫৫ সালে আম্মা ইন্তেকাল করেন। মা অসুস্থ থাকা অবস্থায় কেউ বললেন, ওমরকে খবর দেয়া হোক। মা শুনে বললেন, আমি তাকে দীনের পথে পাঠিয়েছি। কেয়ামতের দিন আমি যদি জিজ্ঞাসিত হই কী নিয়ে এসেছো? আমি বলব ওমরকে নিয়ে এসেছি। মায়ের মৃত্যুর রাতে স্বপ্নে দেখলেন, মা বলছেন- ‘আনা ফিল জান্নাহ।’ আমি জান্নাতে আছি।

পালনপুরী রহ. পারিবারিকভাবে ব্যবসায়ী ছিলেন। আল্লাহ তাকে ব্যবসায় বরকত দিয়েছিলেন। ১৯৫৭ সালে প্রথম হজ করেন। ১৯৫৯ সালে মিসর, লিবিয়া, মরক্কো, ১৯৬০ সালে সিরিয়া ও অন্যান্য আরব রাষ্ট্রে সফর করেন। দাওয়াত ও তাবলিগের জন্য পালনপুরীর জীবন ওয়াক্ফ ছিল। বছরে প্রায় ৮০ বার বিদেশে সফর করতে হয়েছে দাওয়াতি কাজে। দাওয়াতি জীবনে ৪০ বছর দেশে দেশে আম বয়ান ও খাস বয়ান দিয়েছেন।

মুসলিম উম্মাহর জাগরণে মানুষের কল্যাণে তিনি জীবনব্যাপী দাওয়াতি কাজ করেছেন। সর্বশ্রেণির মানুষের প্রিয়ভাজন হজরত মাওলানা পালনপুরী রহ. ১৯৯৭ সালে ইন্তেকাল করেন। তিনি দাওয়াতি কাজ সম্পর্কে বলতেন ‘মরতে মরতে কর যা/করতে করতে মর যা। মরে মরে কর, করে করে মর।’ তাঁর মৃত্যুতে পাকিস্তাানের তাবলিগের মুরব্বি হাজী আব্দুল ওয়াহহাব এক শোকবার্তায় বলেনÑ ওমর পালনপুরী রহ. ছিলেন ইজতেমার নূর ও বরকত।

দারুল উলূম দেওবন্দের মুহতামিম মাওলানা মারগুবুর রহমান রহ. বলেনÑ ‘আল্লাহ তাঁর মুখে নূর দিয়েছিলেন। তাঁর বয়ানে লক্ষ লক্ষ মানুষ হেদায়েতের নূর পেয়েছেন। মুহিউস সুন্নাহ শায়খ আবরারুল হক রহ. এক পত্রে বলেন- ‘আমরা তাঁর ইলম ও মেহনত থেকে বঞ্চিত হয়েছি।’ মুসলিম উম্মাহর প্রিয়পাত্র দাওয়াত ও তাবলিগের প্রাণপুরুষ, মাওলানা মুহাম্মদ ওমর পালনপুরীর জন্ম ১৯২৯ সালে। পিতার নাম ওয়াজিরুদ্দীন। ভারতের পালনপুরে তাঁর জন্ম। টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমায় তাঁর আবেগময় বয়ানের সুরের ধ্বনি আজও মনে পড়ে লাখো মুসল্লির স্মৃতিতে। আল্ল¬াহ তাকে জান্নাতে উঁচু মাকাম দান করুন।

লেখক: আলেম, লেখক, অনুবাদক

কেএল/


সম্পর্কিত খবর


সর্বশেষ সংবাদ