সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪ ।। ৯ বৈশাখ ১৪৩১ ।। ১৩ শাওয়াল ১৪৪৫

শিরোনাম :

শায়খুল হাদিস মাওলানা জাকারিয়া রহ. : যাঁর পৃষ্ঠপোষকতা ছিল তাবলিগের জন্য আশীর্বাদ

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

|| জহির উদ্দিন বাবর ||

‘শায়খুল হাদিস’ বললে উপমহাদেশে সবাই এক বাক্যে চিনেন। জীবনের বড় অংশটুকু ব্যয় করেছেন হাদিসের খেদমতে। হাদিসে নববির আলোকে দাওয়াত ও তাবলিগের মেহনত ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম সাধনা। যে ক’জন মনীষীর তত্ত্বাবধান, পৃষ্ঠপোষকতা ও নির্দেশনায় তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম গতি লাভ করেছে তাদের অন্যতম হলেন শায়খুল হাদিস মাওলানা জাকারিয়া রহ.। তাবলিগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ইলিয়াস রহ.-এর পর এই কাজ পরিচালনায় তিনি নেপথ্যে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। বিখ্যাত আলেম মাওলানা ইয়াহইয়া কান্ধলভী রহ. ছিলেন তাঁর পিতা আর চাচা ছিলেন তাবলিগ জামাতের প্রাণপুরুষ মাওলানা ইলিয়াস রহ.।

শায়খুল হাদিস রহ. ১৩১৫ হিজরির ১১ রমজানুল মোবরক রাত এগারটায় ভারতের উত্তর প্রদেশের মুজাফফরনগর জেলার কান্ধলায় এক ঐতিহ্যবাহী ইলমি খান্দানে জন্মগ্রহণ করেন। আড়াই বছর বয়সের সময় তিনি মা-বাবার সঙ্গে গঙ্গুহতে চলে যান। হজরত গাঙ্গুহী রহ.-এর রুহানি ফয়েজ ও বরকতে গাঙ্গুহ তখন ইলমি পরিবেশের জন্য অত্যন্ত সহায়ক ছিল। যেহেতু ঘরেই লেখাপড়া ও তরবিয়তের পরিবেশ ভালো ছিল, এজন্য তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু করতে একটু দেরি হয়। সাত বছর বয়সের সময় ডা. আবদুর রহমানের কাছে তাঁর লেখাপড়ার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ঘরে থাকাকালীনই তিনি কুরআনে কারিম হিফজ করেন। মূল শিক্ষাটা হাসিল করেন তাঁর বাবা মাওলানা ইয়াহইয়া রহ.-এর কাছ থেকে, যাঁর ইলমি সুখ্যাতি ছিল ব্যাপক। বাবার কঠোর দৃষ্টিতে থাকার কারণে শায়খুল ইসলাম রহ.-এর মধ্যে ইলমের প্রতি গভীর মনোযোগ সৃষ্টি হয়। একবার জুতা হারিয়ে যাওয়ার পর ছয় মাস পর্যন্ত তিনি মাদরাসার বাইরে যাননি। সতের বছর বয়স পর্যন্ত কারও সঙ্গে বিনা প্রয়োজনে কথা বলাও নিষেধ ছিল। এভাবে বাবার কঠোর নজরদারিতে থেকে মাজাহেরুল উলুম সাহারানপুর থেকে তিনি শিক্ষা সমাপ্ত করেন। হাদিস শাস্ত্রসহ দর্শন, মানতেন, ফালসাফা, ফিকাহ ও উসুল শাস্ত্রে তিনি ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তাঁর উস্তাদ মাওলানা খলিল আহমদ সাহারানপুরী রহ. তাঁকে ‘শায়খুল হাদিস’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এই অভিধায় তিনি জগদ্বিখ্যাত।

শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করার পর শায়খুল হাদিস রহ. ১৩৩৫ হিজরির মহররম থেকে মাজাহেরুল উলুম সাহারানপুরে দরস দান শুরু করেন। দুই বছর পড়ানোর পরই তিনি বুখারি শরিফের দরস দেন। তাঁর দরসের সুনাম অল্প দিনেই ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। ছাত্ররা তাঁর কাছে হাদিসের দরস নেওয়ার জন্য ভিড় করতে থাকে। তিনি হজরত মাওলানা খলিল আহমদ সাহারানপুরী রহ.-এর কাছ থেকে খেলাফত লাভ করে আধ্যাত্মিক সাধনাও চালিয়ে যান সমান তালে। দরস-তাদরিসের পাশাপাশি তাসনিফাত বা লেখালেখি ও রচনায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ইলমে হাদিসের ওপর তাঁর লিখিত ও সংকলিত গ্রন্থগুলো হলো- আওজাজুল মাছালেক, লামেউদদুরারী, আল আবওয়াব ওয়াত তারাজেম, আল কাওকাবুদ্দররী, খাছায়েলে নববী প্রমুখ। সমকালীন আকাবির ও বুজুর্গদের সঙ্গে তাঁর তায়াল্লুক ছিল সুগভীর। সবার কাছ থেকে তিনি ফয়েজ ও বরকত হাসিল করেছেন।

দাওয়াত ও তাবলিগের সঙ্গে হজরত শায়খুল হাদিস রহ. বিশেষ সম্পৃক্ততা রাখতেন। এই কাজের সূচনালগ্ন থেকেই তিনি এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মাওলানা ইলিয়াস রহ.-এর ইন্তেকালের পর তিনিই সর্বোচ্চ মুরব্বি ও রাহবার হিসেবে সামনে আসেন। পরবর্তী দুজন আমির নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকাই মুখ্য ছিল। দাওয়াতি এই মিশন পরিচালনার জন্য সর্বাত্মক সহযোগিতা তিনি করতেন। নিজেও বিভিন্ন দাওয়াতি সফর ও ইজতেমায় শরিক হতেন। বর্তমানে ইলমি ও দাওয়াতি ময়দানে যারা বহুমুখী খেদমত আঞ্জাম দিচ্ছেন তাদের বেশিরভাগই শায়খুল হাদিস রহ.-এর ছাত্র কিংবা খলিফা। দীনের যেসব বীজ তিনি অঙ্কুরিত করে গেছেন তা আজ ফলদার বৃক্ষরূপে উম্মতকে নানাভাবে উপকৃত করছে। কেয়ামত পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকবে।

শায়খুল হাদিস রহ. জীবনের শেষ দিনগুলোতে হিজরত করে মদিনা মুনাওয়ারায় চলে গিয়েছিলেন। সেখানেই ৮৭ বছর বয়সে ১ শাবান ১৪০২ হিজরি মোতাবেক ২৪ মে ১৯৮২ সালে ইন্তেকাল করেন। শুয়ে আছেন সোনার মদিনার কোমল পরশে, কিন্তু তাঁর সাধনার ফসল তাবলিগ জামাতের যাত্রা আজ ভুবনময়। রহমতের ধারা সিঞ্চিত হোক তাঁর নুরানি রূহেÑএটাই আমাদের একান্ত দোয়া।

লেখক : আলেম ও সাংবাদিক 

কেএল/


সম্পর্কিত খবর


সর্বশেষ সংবাদ